নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, শনিবার ১৯ ডিসেম্বর ২০২০, ৪ পৌষ ১৪২৭, ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪২
মুক্তিযুদ্ধে আলেম সমাজের অবদান
এহসান বিন মুজাহির
দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যদিয়ে সবুজ-শ্যামল স্বাধীন দেশ হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান পেয়েছে হিজল তমাল, তরুলতা আর সবুজ শ্যামলতায় ঘেরা রূপসী বাংলাদেশ। বিশ্বের দরবারে আমাদের আত্মপরিচয় ঘটেছে স্বাধীন জাতি হিসেবে। স্বাধীনতা প্রতিটি জাতির গৌরব ও অহংকারের বিষয়। ঊনিশ' একাত্তর সালের ষোল ডিসেম্বর বাংলাদেশ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী থেকে মুক্ত হয়।১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের। পাকিস্তানিরা ছিল জালিম আর এদেশের নিরীহ মানুষরা ছিলেন মজলুম। সুস্থ-বিবেকসম্পন্ন কোনো মানুষ কখনো জালিমের পক্ষাবলম্বন করতে পারে না। মজলুম মানুষকে সাহায্য করা এবং তাদের পাশে দাঁড়ানো নৈতিক দায়িত্ব। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর জুলুমের বিরুদ্ধে আলেম সমাজ প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বহু আলেম এদেশের মুক্তিকামী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে দেশের মানুষকে পাকিস্তানি জালিম শাসকদের কবল থেকে মুক্ত করেছিলেন। অনেক আলেম সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন।

আলেম সমাজের এক বিশাল অংশ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সক্রিয় অবস্থান নেন। এদের মধ্যে অনেকেই রণাঙ্গনে সক্রিয় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন, অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য খেতাবপ্রাপ্ত হন। অনেকে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য মানুষকে নানাভাবে উৎসাহিত এবং সহযোগিতা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে আলেমদের অবদান অনেকটাই ইতিহাসের অন্তরালে। প্রকৃত ইতিহাস আড়ালে থাকার কারণে অনেকেই ঢালাওভাবে আলেম সমাজকে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি হিসেবে সমাজে উপস্থাপন করছেন, যা খুবই দুঃখজনক। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসে স্বাধীনতা সংগ্রামে আলেমদের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। ইতিহাসের পাতায় যেসব আলেমের নাম নেই, নিম্নে এসব আলেম-উলামার কথা আলোকপাত করা হলো। সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন বহু কওমী উলামায়ে কেরাম ও পীর-মাশায়েখগণ।

তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলেন দেশবরেণ্য আলেম মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.), ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম, শায়খুল ইসলাম মাওলানা আমীমুল এহসান, মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ, কুতুবে দাওরান মাওলানা লুৎফুর রহমান বরুণী, চরমোনাইর পীর ফজলুল করীম, আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ, মাওলানা আবুল হাসান যশোরী, মাওলানা মুহাম্মদ কামরুজ্জামান চিশতী। তাছাড়া মাওলানা আবদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী, মাওলানা আবদুস সোবহান, মাওলানা দানেশ, মাওলানা আতাউর রহমান খান, মাওলানা আহমাদুল্লাহ আশরাফ, মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, মাওলানা ইমদাদুল হক আড়াইহাজারী (রহ.), মাওলানা ফরিদ উদ্দীন মাসউদ প্রমুখ বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সার্টিফিকেটের অধিকারী।

বাংলাদেশের শীর্ষ আলেম হযরত মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেন। মাওলানা এমদাদুল হক আড়াইহাজারী মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আলেমদের করণীয় কী এ ব্যাপারে হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা হচ্ছে জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের যুদ্ধ। পাকিস্তানিরা জালেম আর আমরা হচ্ছি মজলুম। পাকিস্তানিরা বাঙালিদের ওপর অত্যাচার করেছে, সুতরাং তারা জালেম। জুলুম আর ইসলাম এক হতে পারে না। তুমি যদি মুসলমান হও তবে পাকিস্তানিদের পক্ষে যাও কীভাবে? এটা তো জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের প্রতিবাদ প্রতিরোধ। মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ দীর্ঘদিন আত্মগোপন থেকে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। তার নির্দেশ ও অনুপ্রেরণায় বহু মানুষ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যার কারণে পাকিস্তানি হানাদাররা এই আলেমের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়।

আওলাদে রাসূল (সা.) হযরত হোসাইন আহমদ মাদানীর (রহ.) বিশিষ্ট খলিফা, দেশবরেণ্য বুজুর্গ ফেদায়ে ইসলাম মাওলানা শায়খ লুৎফুর রহমান বর্ণভী ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিভিন্ন সমাবেশে যুদ্ধজয়ের দোয়া করতেন। তার বাড়ি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়স্থল। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ নিরাপদ আশ্রয় লাভ করেছিল তার সানি্নধ্যে। আড়াইহাজার থানার কমান্ডার মরহুম শামসুল হকের অধীনে আল্লামা এমদাদুল হক আড়াইহাজারী (রহ.) মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলেন, '১৯৭১ সালে যখন আমি লালবাগ মাদ্রাসার ছাত্র তখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধ শুরু হলে আমার মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যায়। তখন আমি হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) কে প্রশ্ন করেছিলাম, হুজুর এ যুদ্ধে আমাদের ভূমিকা কি? তখন হুজুর আমাকে বললেন পাকিস্তানি জালিম হানাদার বাহিনীর জুলুম থেকে এ দেশের মানুষকে রক্ষা করা অবশ্যই সকলের কর্তব্য। তাই বসে থাকার আর সময় নেই, জালিমদের কবল থেকে মজলুমদের বাঁচানোর জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ কর।

শায়খুল ইসলাম মাওলানা আমীমুল এহসান ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের প্রধান মুহাদ্দিস ছিলেন। তিনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হত্যা ও নারী ধর্ষণের বিরুদ্ধে ফতোয়া দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় মাওলানা কাজী মুতাসিম বিল্লাহের দায়িত্ব ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা এবং মাদ্রাসা ছাত্রদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করা। জামিয়া ইউনুসিয়া ব্রাহ্মণবাড়ি কওমি মাদ্রাসার মুহতামিম ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ফতোয়া দিয়েছিলেন, তার ফতোয়া শুনে ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার অনেক আলেম মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও তিনি বহু মুক্তিযোদ্ধাকে তার নিজ বাসায় আশ্রয় দিয়েছিলেন। পাকিস্তানের হযরত মাওলানা মুফতি মাহমুদ (রহ.) ও বাঙালি মুসলমানদের পক্ষে ছিলেন। তার বক্তব্য ছিল বাঙালিদের পক্ষে।

স্বাধীনতা সংগ্রামে অবিসংবাদিত মুসলিম নেতা, বিশ্বের প্রখ্যাত আলেম আওলাদে রাসুল সাইয়্যেদ আসয়াদ আল মাদানী (রা.) এর ভূমিকা অবিস্মরণীয়। যখন পাকিস্তানি বাহিনী এ দেশের নিরীহ মানুষের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছিল তাৎক্ষণিকভাবে তিনি পাকিস্তানদের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েিেছলেন এবং নিরীহ বাঙালিদের পক্ষে জোরালো বক্তব্য রাখলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে উলামায়ে কেরামদের অবদান দেখে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার মেজর আবদুল জলিল হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করলেন। তিনি বাইয়াত গ্রহণের পর তাকে তার ভক্ত ও শিষ্যরা প্রশ্ন করলেন আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে কীভাবে হাফেজ্জী হুজুরের মতো রাজাকার এক ব্যক্তির কাছে মুরিদ হলেন। জবাবে তিনি বলেছিলেন-হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) কোনো রাজাকার নন, তিনি যুগশ্রেষ্ঠ আলেম এবং একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক।

মাওলানা শাকের হোসাইন শিবলী কর্তৃক লিখিত 'আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে' গ্রন্থসহ বিভিন্ন ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, স্বাধীনতা সংগ্রামে সংগঠক হিসেবে এবং এদেশের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে উৎসাহ ও সহযোগিতায় আলেম সমাজের ভূমিকা অনস্বীকার্য। একথা পরিষ্কার যে, আলেম সমাজ কখনো স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন না, বরং আলেমরা দেশপ্রেমিক। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আলেম সমাজকে আড়াল করে রাখা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অধিকাংশ প্রবন্ধ-নিবন্ধ এবং প্রকাশিত বিভিন্ন গ্রন্থে মুক্তিযুদ্ধে আলেমদের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে কৃপণতা করা হচ্ছে। এরচেয়ে বড় পরিতাপের বিষয় হচ্ছে আলেম সমাজের অবদানকে নেতিবাচকভাবেই তুলে ধরা হয়েছে এবং এখন নানাভাবে প্রয়াস চালানো হচ্ছে। বর্তমানে আলেমসহ পাঞ্জাবি, দাড়ি, টুপি দেখলেই তাদের স্বাধীনতার শত্রু এবং রাজাকার মনে করা হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার এখন সময়। মুক্তিযুদ্ধে আলেমদের অবদানের কথা সবশ্রেণীর মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে তুলে ধরতে হবে।

আমাদের কথা সুস্পষ্ট যে, ঊনিশ শ' একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, নিরপরাধ-নিরীহ মানুষের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়েছে, হানাদার বাহিনীর পদলেহন করেছে, বাঙালি মা-বোনদের ওপর পাশবিক নির্যাতনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, অহেতুক হত্যাকা- ঘটিয়েছেন, তারা যে দলের হোক না কেন ধর্মীয় ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তারা জঘন্য অপরাধী। প্রকৃত অপরাধীদের কঠিন শাস্তি হোক। এসব অপরাধীরা দেশ-জাতির শত্রু। কাজেই আলেম সমাজকে ঢালাওভাবে রাজাকার, আল বদর, আস শামস প্রমুখ নামে আখ্যায়িত করা এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি হিসেবে সমাজে উপস্থাপন করা সমাজ-সচেতন কেনো ব্যক্তি এবং বুদ্ধিজীবী রাজনীতিবিদদের জন্য শোভনীয় নয়। বরং প্রকৃতপক্ষে আলেমরা দেশপ্রেমিক।

এহসান বিন মুজাহির : লেখক

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
আজকের নামাজের সময়সূচীঅক্টোবর - ২৯
ফজর৪:৪৬
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৪৫
মাগরিব৫:২৫
এশা৬:৩৯
সূর্যোদয় - ৬:০৩সূর্যাস্ত - ০৫:২০
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
২২৫২৭.০
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদক : আহ্সান উল্লাহ্। প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ৯৩৫৭৭৩০ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ djanata123@gmail.com, bishu.janata@gmail.com
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.