নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, রোববার ১৭ জুন ২০১৭, ৩ আষাঢ় ১৪২৪, ২১ রমজান ১৪৩৮
প্রসবজনিত ফিস্টুলা প্রতিরোধে সচেতনতা
নাহিদ তন্ময়
মালেকা বেগমের বয়স এখন ২৬ বছর। ১৪ বছর বয়সে মালেকার বিয়ে হয় কঙ্বাজার জেলার ফতেহার কুল গ্রামের দিনমজুর মোহম্মদ আলমের সাথে। বিয়ের দুই বছর পর গর্ভবতী হয়। সে কোন চেক-আপ করে নাই। শুধু দুটো টিকা নিয়েছে। নয় মাসে প্রসব ব্যথা ওঠে। দাইয়ের হাতে পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। প্রথম বাচ্চার তিন বছর পর আবার গর্ভবতী হয় মালেকা। এবারও নয় মাসে ব্যথা শুরু হয়। ডাক্তার ডাকা হয় নাই, বাড়িতেই থাকে। ব্যথা এক দিন পর থেমে যায়। তিন দিন পর আবার ব্যথা শুরু হয়। দাই এসে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। কঙ্বাজারের রামু হাসপাতাল থেকে নার্স এনে চেষ্টা করা হয়, সেও কিছু করতে পারে না। একদিন পর কঙ্বাজার আল ফুয়াদ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে ডাক্তার না থাকায় নার্স ইঞ্জেকশন দিয়ে বাচ্চা প্রসবের চেষ্টা করে, সেও ব্যর্থ হয়। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। মুমূর্ষ অবস্থায় হাসপাতাল থেকে মালেকাকে বাড়িতে নিয়ে আসে। পরের দিন সকালে তাকে মালুমঘাট এমসিএইচ হাসপাতালে নিয়ে যায় সেখানে অপারেশন করে একটি মরা বাচ্চা প্রসব করায়। বাচ্চা প্রসবের পর থেকেই সব সময় প্রস্রাব, পায়খানা ঝরে। স্বামী মালেকাকে হাসপাতালে রেখে পালিয়ে যায়। এমসিএইচ হাসপাতালে তিন বার অপারেশনের পর মালেকা সুস্থ হয়। মালেকা জানায়- আমি এখন সুস্থ। কঙ্বাজার মালুমঘাট এমসিএইচ হাসপাতালে বিনা টাকায় অপারেশন হয়েছে। আমার স্বামীর কোন খোঁজ নেয় না। টাকা দিয়ে চিকিৎসা করাতে হলে সারাজীবনেও তা হতো না।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, প্রসব ব্যথা একদিনের অধিক স্থায়ী হলে বিলম্বিত প্রসবের সময় সন্তানের মাথা জরায়ুর মুখে আটকে থাকার ফলে মূত্রথলি ও পায়ুপথ প্রচন্ড চাপের মধ্যে থাকে। ফলে এসব স্থানে রক্ত চলাচলে বাধার সৃষ্টি হয় এবং পচন ধরে। অল্পকিছুদিনের মধ্যে সেই স্থানে ছিদ্র তৈরি হয়। ফলে প্রস্রাব-পায়খানার অনবরত ঝরতে থাকে এ সমস্যাটিই ফিস্টুলা। এ সমস্যার পাশাপাশি ফিস্টুলা রোগীরা আরো অনেক শারীরিক সমস্যায় ভুগতে পারেন। তবে ফিস্টুলা আক্রান্ত রোগীরা সামাজিকভাবে যে অবহেলার এবং অবমাননার শিকার হয় তা তাদের জীবনকে সবচেয়ে বেশি দুর্বিসহ করে তোলে।

বিশেষজ্ঞদের মতে দেশে প্রায় ৭০ হাজার ফিস্টুলায় আক্রান্ত বলে অনুমান করা হয়। প্রতিবছর অন্তত দুই হাজার ফিস্টুলায় নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে। দেশে প্রতি হাজার বিবাহিত নারীর মধ্যে ১ দশমিক ৭ জন ফিস্টুলায় আক্রান্ত। ফিস্টুলায় আক্রান্তদের ৭৬ শতাংশই প্রসবজনিত এবং বাকি ২৪ শতাংশ সার্জিক্যাল বা আঘাতজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত। প্রসবকালীন ফিস্টুলা একটি জটিল রোগ। এ রোগে আক্রান্ত রোগীদের অনবরত প্রস্রাব, পায়খানা ঝরার ফলে শরীর থেকে বাজে গন্ধ ছড়ায়। মানুষ কাছে আসতে চায় না, সবাই ঘৃনা করে।

প্রতিবছর ২৩ মে সারা বিশ্বে পালিত হয় 'ফিষ্টুলা সচেতনতা দিবস'। এ বছর ফিষ্টুলা দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে- 'ঐড়ঢ়ব, যবধষরহম ধহফ ফরমহরঃু ভড়ৎ ধষষ্থ 'আশা, আরোগ্য এবং আত্মমর্যাদা সবার জন্য'। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এখনো অনেক নারী প্রসবজনিত ফিস্টুলা রোগে ভোগেন। এনজেন্ডারহেল্থ বাংলাদেশ গত ২০০৩ সালে ইউএনএফপি'র অর্থায়নে বাংলাদেশ প্রসবজনিত ফিস্টুলা পরিস্থিতির উপর একটি জরিপ পরিচালনা করে, যাতে দেখা যায় যে বাংলাদেশে প্রতি তিন হাজার বিবাহিত নারীর মধ্যে পাঁচ জন প্রসবজনিত ফিস্টুলায় ভুগছেন। ২০০৫ সাল থেকে এনজেন্ডারহেলথ ইউএসএআইডি'র আর্থিক সহায়তায় ফিস্টুলা প্রতিরোধ, ফিস্টুলা রোগীদের চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের লক্ষ্যে তিনটি বেসরকারি হাসপাতালে কার্যক্রম শুরু করে।

সঠিক সময়ে প্রসবজনিত সেবা না পাওয়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীরা আক্রান্ত হচ্ছে ফিস্টুলায়। প্রসবজনিত জটিলতা এবং কোথায় গেলে সঠিক চিকিৎসা সেবা পাওয়া যায় সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য না জানা এবং সার্জিক্যাল বা আঘাতজনিত কারণে দেশের অনেক নারী ফিস্টুলায় ভুগছেন। গত ১৫ মে ২০১৭ তারিখে বাংলাদেশ প্রেস ইনিস্টিটিউটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ব বিদ্যালয়ের ফিস্টুলা সেন্টার-এর আয়োজনে 'মিডিয়া লিডার্স ওয়ার্কসপ অন ফিস্টুলা কমিউনিকেশন' বিষয়ক ওয়ার্কশপে বক্তারা বলেন, দেশে ফিস্টুলায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা কত তার সঠিক তথ্য নেই তবে ২৩শে মে আন্তর্জাতিক ফিস্টুলা দিবসের আগে সঠিক তালিকা তৈরি করা সম্ভব হবে। দেশের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর মাধ্যমে ফিস্টুলা রোগী চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে ১০টি সরকারি হাসপাতাল এবং ৮টি বেসরকারি হাসপাতাল ও সেবাকেন্দ্রে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালগুলো হলো- ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা; এম.এ.জি. ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট; রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রাজশাহী; ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ময়মনসিংহ; স্যার সলিমুল্লাহ্ মেডিকেল কলেজ এবং মিটফোর্ড হাসপাতাল, ঢাকা; খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতাল, খালনা; শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ররিশাল; রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর; চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল; চট্টগ্রাম; শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রগুড়া। বেসরকারি হাসপাতালগুলো হলো-কুমুদিনী হাসপাতাল, মির্জাপুর, টাংগাইল; ল্যাম্ব হাসপাতাল, পার্বতীপুর, দিনাজপুর; আদ্-দ্বীন হাসপাতাল, বড় মগবাজার, ঢাকা; আদ্-দ্বীন সকিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, যশোর; আদ্-দ্বীন আকিজ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, খুলনা; ডা: মুত্তালিব কমিউনিটি হাসপাতাল, ঢাকা; মাম্স ইনিস্টিটিউট অব ফিস্টুলা এবং উইমেন্স হেলথ, ঢাকা; হোপ ফাউন্ডেশন হাসপাতাল, রামু, কঙ্বাজার; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ), শাহবাগ, ঢাকা।

প্রসবজনিত ফিস্টুলা কোন অভিশাপ নয়, এটি প্রসবকালীন জটিলতাজনিত একটি রোগ। সফল অপারেশন ফিস্টুলা সারিয়ে তুলে মায়েদের স্বভাবিক জীবন দান করতে পারে। ফিস্টুলায় আক্রান্ত মায়েরা একটু সচেতন হয়ে উলি্লখিত হাসপাতালগুলোতে গেলে সম্পূর্ণ বিনা খরচে তারা চিকিৎসা সেবা নিতে পারেন। মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের উন্নয়নে সরকার অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে কাজ করে চলেছে। বাল্য বিবাহ ফিস্টুলায় আক্রান্ত হওয়ার একটি বড় কারণ। তবে দেশে বাল্য বিবাহ রোধে জনসচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। কিশোরীরা এখন নিজেরাই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করেছে।

গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক হওয়ার ফলে গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার হার বেড়েছে। স্বাস্থ্যসেবা এখন গ্রামাঞ্চলেও ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়েছে। তাই প্রসব সংক্রাস্ত যে কোন জটিলতা দেখা দিলেই গ্রাম্য দাই বা হাতুরে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে হবে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীর স্মরণাপন্ন হতে হবে। তাহলে ফিস্টুলার মতো জটিল রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

পিআইডি ফিচার

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
আজকের নামাজের সময়সূচীঅক্টোবর - ২৫
ফজর৪:৪৪
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৪৭
মাগরিব৫:২৮
এশা৬:৪১
সূর্যোদয় - ৬:০০সূর্যাস্ত - ০৫:২৩
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
২৬৫২৩.০
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদক : আহ্সান উল্লাহ্। প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ৯৩৫৭৭৩০ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ djanata123@gmail.com, bishu.janata@gmail.com
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.