নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, রোববার ১৭ জুন ২০১৭, ৩ আষাঢ় ১৪২৪, ২১ রমজান ১৪৩৮
একটি বিদেহী ঈদ
শান্তা ফারজানা
আকবরের ঠিক সামনেই মনা দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আকবর ওকে ছুঁতে পারছে না; পারছে না 'মনা মনারে' বলে জড়িয়ে ধরতেও। কেবলই তাকিয়ে থাকে। পাথর দৃািষ্ট নিয়ে। সে দৃষ্টিতে রাগ নেই, ক্ষোভ নাই, নেই বিস্বাদ। আছে কেবল বেদনা। আকবর শুয়ে আছে। তার নাকে আর কানে তুলা গোঁজা। মাথার কাছে আগরবাতি জ্বলছে। একটু আগে তাকে গোসল করানো হয়েছে। পাক পবিত্র করে শোয়ানো হয়েছে খাটিয়ায়। খাটিয়াটা স্টিলের। চারপাশে তারার নকশা দেয়া। আগে অবশ্য মানুষ কাঠের খাটিয়া ব্যবহার করতো। আকবরের দেহটা সাদা কাপড়ে মোড়ানো, কেবল মুখটা দেখা যাচ্ছে। ললাটে সুন্দর হাসির রেখা ফুটে উঠেছে। রূপালী চন্দ্রের শুভ্রতা ফুটে আছে মুখে। কাঁচাপাকা দাঁড়িতে নীরবতার ঢেউ। কপালে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ছাপ।

আকবর ঘুমিয়ে আছে। যতটা নির্ভার তার চেহারা, ততটা ভারমুক্ত ছিল না সে আসলে। ঈদের দিন রাত গভীরে দেহ ছেড়ে চলে যায় তার প্রাণটা। ভোরের সূর্য ওঠার আগেই অস্ত যায় তার জীবন_রবি। লিভার সিরোসিসের রোগী ছিলেন তিনি। ধুকেধুকে পার করেন জীবনটাকে। তার শারীরিক যন্ত্রণা যতখানি ছিল, তার চেয়েও বেশি ছিল তার মানসিক যন্ত্রণা।

মনা কাঁদছে না। বিহ্বলের মতো দাঁড়িয়ে আছে। আকবরের খুব ইচ্ছে করে মনার হাতের উপরে হাত রাখতে। নিজের শায়িত দেহের সামনে আত্মীয়-স্বজনদের উপচেপড়া কান্না তাকে প্রকম্পিত করে। ছোট মেয়েটার হেঁচকি উঠেছে। সে কাঁদছে আর হেঁচকি তুলছে।

-আরে কেউ ওকে এক গ্লাস পানি দেয় না কেন? মেয়েটার জন্য মায়া হয়। অসুস্থ একটা মেয়ে। এই তো কয়েকদিন আগেও হাসপাতালের বিছানায় শয্যাশায়ী ছিল। মেয়েটারও হার্টের সমস্যা আছে। একাধারে কোনো কাজ করলে হার্টটা ওর ধরফর করে। হার্ট ঠিকমত পাম্প করতে না পারলে হেঁচকি ওঠে। আকবরের বউ মলি্লকা ওর পায়ের উপর গড়িয়ে পড়ে কাঁদছে। ওর চোখের পানি আকবরের পায়ের আঙুল, পায়ের পাতা বেয়ে সাদা কাপড়টুকু ভিজিয়ে দিচ্ছে। মলি্লকা, তুমি আর কেঁদোনা। আকবর স্ত্রীর পিঠে পরম মমতায় হাত রাখেন। মলি্লকা টের পায় না, প্রাণটা দেহ থেকে বেরিয়ে গেলে শক্তি থাকে না প্রাণের, তেমন দেহেরও। মলি্লকা...শোন, আকবরের নৈশব্দিক চিৎকার মলি্লকার কানো স্পর্শ করে না। সে কাঁদতেই থাকে।

-অনেক টাকা ঋণ রেখে মরেছেরে।

_ আপা আফনে জানেন ক্যামনে।

_ জানুম না, আপনাগো মনা ভাই আমার আমারে কিছু না বললেও আমি জাইনা যাই। বাড়ি ভাড়া, ফার্মেসির বাকি, সামনের মুদি দোকানের বাকি...। সব মিল্লা মোট ৩৭ হাজার ছয়শ পঁচাশি টাকা বাকি। দিনে রাতে ব্যথা আছে কি নাই ঐ ফার্মেসির ডাক্তারগোরে ডাইকা আনতো। একটা টাকা দেয় নাই। সব খবর আইয়া পড়ছে, আপনাগো মনা ভাইয়ের উপর। রাগে আমার শইল্যে আগুন জ্বইল্যা উডে। মলি্লকায় দিবো কইত্তে? তাও আমি একবার ভাবছিলাম কথাটা কই, কিন্তু আপনের মনা ভাই তো মুখই খুলবার দিলো না...

পাশের রুমে খাটের উপর বসে আছে মনার বউ আর পাশের বাড়ির খালা। সবাই যেখানে নিথর সেখানে মনার বউ ৩৭ হাজার ছয়শ পঁচাশি টাকায় শোকে মুহ্যমান। আকবরের খুব কষ্ট। আজ তার কোনো পকেট নেই। অথচ এই মানুষটাকে এমন ঈদ তো আছেই : যখন তখনই পকেট থেকে হাজার টাকার নোট দিয়ে দিয়েছে। রুমা আজ তুমি ৩৭ হাজার টাকার ঋণ নিয়ে আফসোস কর, অথচ আমি আকবর ভাই তোমাকে আজ পযন্ত কত টাকা দিয়েছি তার কোনো হিসাব রেখেছ কি? আকবরের অদৃশ্য কণ্ঠের প্রতিবাদ শুনতে পায় না রুমা। সে টাকার পাওয়া না পাওয়ার হিসেবে মত্ত থাকে।

আকবর মনার পাশে এসে দাঁড়ায়। মনা তার ছোট ভাই, বড় আদরের ছোট ভাই। মনার চোখে শূন্যতা। আত্মগ্লানি কুঁড়ে কুড়ে খচ্ছে তাকে। মনা বারান্দায় এসে ভাইয়ের চেয়ারে এসে বসে। এই চেয়ারটার বাম হাতলটা ভেঙে গেছে। আকবর ভাই অনেক বার অনুরোধ করা সত্ত্বেও সে হাতলটা ঠিক করতে পারেনি। কী দরকার? বিক্রি করে দিলেই হয়? বলে শূন্যে ছুড়ে দিয়েছে বিরক্তি। কিন্তু বাবার স্মৃতি বলে বারবার ওটাকে সামনে রেখেছে আকবর ভাই।

বাবা '৭১-এর যুদ্ধে শহীদ হয়ে গেছেন। তার মুখটা মনে পড়ে না। মাথার উপর ছাতা বয়েছিলেন এই বড় ভাই। 'মনা' নামটা ভাইয়েরই দেয়া। ভাই মজা করে ছোট বেলায় একটা স্মৃতিচারণ করতেন প্রায়ই। একদিন ওকে চাঁদ দেখনোর জন্য দুই কাঁধে দাঁড় করিয়ে 'আয় আয় চাঁদ মামা' ছড়াটা কাটছিলেন ভাইয়া। মনাও 'অ' 'অ' আওয়াজ করছিল। হঠাৎ ভাইয়ার ঘাড়ের উপরই প্রাকৃতিক কর্ম সেরে দিয়েছিল। ভাইয়া পরম আনন্দসহকারে কৃত্রিম রাগ করে_ মনার হালকা হবার ঘটনার বর্ণনা দিতেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ঘাড়ে তুলে রেখেছিলেন তাকে ভাইয়া। সে উপলব্ধি করতে পারেনি। যদি পারতো তাহলে স্ত্রী রুমা আর শ্বশুরের কুবুদ্ধিতে নারায়ণগঞ্জের পুরো বাড়িটা কব্জাগত করতো না। দুই ভাইয়ের রক্তে ঘামে নির্মিত পাঁচতলা দালানের পুরোটাই নিজের ভোগদখলে নিতোনা। জালিয়াতি করে বাড়ির দলিল নিজের নামে করিয়ে নিতো না। ভাই তার লিভার সিরোসিসের মতো কঠিন যন্ত্রণায় ধুঁকেধুঁকে নীরবে চলে গেছে। সে কোনো সহযোগিতা করতে পারেনি। আজ বড় শূন্য লাগে, বড় নিঃস্ব লাগে। রকিং চেয়ারে দুলতে থাকে মনা। সেই ছোট বেলায় ভাইয়ের বুকে ঠিক যেভাবে দুলতো। দুলতে দুলতে ঘুমিয়ে পড়ে। আকবর ভাইয়ের কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসে। দুই ভাই সারা দুপুর হাঁটু কাদায় মাছ ধরতো, সাদা মেয়ের কোল ছুয়ে ঘুড়ি উড়াতো, বকুল ফুল গেঁথে গেঁথে মালা বানাতো, বাঁশের গোলপোস্ট গেঁথে ফুটবল খেলতো। বিদেহী আকবরের স্পর্শকাতর চোখেও রেখাপাত করে বায়বীয় অশ্রু। আকবরকে হতভম্ব করে দেয় এক নির্মম চিৎকার। চিৎকারটা রুমার। সে মনার মাথাটা বুকের উপর নিয়ে চিৎকার করছে। আকবরের পাশে এসে দাঁড়ায় হাজার ভুলের ভারে ন্যুব্জ কথিত ভারাক্রান্ত অস্পৃশ্য মনা...।
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
আজকের নামাজের সময়সূচীসেপ্টেম্বর - ২২
ফজর৪:৩২
যোহর১১:৫২
আসর৪:১৪
মাগরিব৫:৫৮
এশা৭:১১
সূর্যোদয় - ৫:৪৭সূর্যাস্ত - ০৫:৫৩
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
২৫৯১৯.০
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদক : আহ্সান উল্লাহ্। প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ৯৩৫৭৭৩০ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ djanata123@gmail.com, bishu.janata@gmail.com
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.