নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, রোববার ১৭ জুন ২০১৭, ৩ আষাঢ় ১৪২৪, ২১ রমজান ১৪৩৮
মূর্তি ভাস্কর্য ও রাজনীতি
মোজাফফর হোসেন
শিল্পকলার ধারণা মতে মূর্তি ও ভাস্কর্যের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। তবে সব ভাস্কর্যই মূর্তি কিন্তু সব মূর্তিই ভাস্কর্য নয়। মূর্তি এবং ভাস্কর্যের মধ্যে যে পার্থক্যটি রয়েছে সেটি হলো ভাবগত পার্থক্য। মূর্তি হলো কোনো বস্তুর রূপ যার মধ্যে কোনো প্রকার অভিব্যক্তির চিহ্ন স্থান পায় না। আর ভাস্কর্যে বস্তুর অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটে। বস্তুর ভেতরের অবস্থা যখন মূর্তির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে প্রকাশ পায় অর্থাৎ যে মূর্তিতে বস্তুর অন্তর্নিহিত অবস্থা যেমন- রাগ, হাসি, হিংস্রতা, ক্ষিপ্রতা, ঘৃণা, গতি, স্থবিরতা ইত্যাদির প্রকাশ প্রত্যক্ষ করা যায় তখন সে মূর্তি ভাস্কর্য হয়ে ওঠে। মূর্তিকে ইংরেজিতে বলা হয় 'স্টাচু আর ভাস্কর্যকে বলা হয় স্কাল্পচার। আদিকাল থেকে বঙ্গদেশে মূর্তি এবং ভাস্কর্য উভয়েরই সমাবেশ লক্ষত করা গেছে। বিষয়বস্তুর দিক থেকে মূর্তি ও ভাস্কর্য আলাদা আলাদাভাবে শ্রেণীভুক্ত হয়েছে। যেমন ধর্মনির্ভর দেবদেবীর মূর্তি ও ভাস্কর্য এবং সামাজিক জীবনাচারনির্ভর মূর্তি ও ভাস্কর্য। মূর্তি ও ভাস্কর্য স্থাপন নিয়ে বাংলাদেশে মাঝেমধ্যে হট্টগোল হতে দেখা যায়। এ দেশে ত্রয়োদশ শতকের আগে গুপ্ত, পাল ও সেন আমলে ব্যাপকভাবে মূর্তি ও ভাস্কর্যের প্রচলন ছিল। মুসলিমদের পদার্পণের ফলে সে ধারা ব্যাহত হতে থাকে। দেশ স্বাধীনের পর আবার এ দেশে মূর্তি ও ভাস্কর্যের প্রসার লক্ষ্য করা গেছে। সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে স্থাপন করা ভাস্কর্য সে ধারারই প্রচেষ্টা মাত্র। যা সরানোর দাবি ইসলামি সংগঠনগুলো করে আসছিল।

হেফাজতে ইসলাম এবং ইসলামি মূল্যবোধে বিশ্বাসী জনগণের দাবির প্রতি গুরুত্বারোপ করে ভাস্কর্য অপসারণে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে গ্রিক দেবী থেমিস লেডি জাস্টিসিয়ার আদলে স্থাপিত ভাস্কর্যটি অপসারিত হয়েছে। এতে ইসলামি মূল্যবোধে আস্থাশীল জনসাধারণের মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যানারে জমায়েত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করা হয়েছে। ভাস্কর্যটি অপসারণের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ভাস্কর্যটি সরানোর ব্যাপারটি প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় হয়নি, এটি হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তে। সরকারি দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও অনুরূপ দাবি করে বলা হয়েছে ভাস্কর্য অপসারণের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নয়, হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব সিদ্ধান্তে। এদিকে ইসলামি সংগঠনগুলো ভাস্কর্য সরানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানিয়েছে। আবার সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট পরিষ্কার করে না বললেও তাদের বক্তব্যের আকার-ইঙ্গিতে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, ভাস্কর্য অপসারণের ব্যাপারটি কেবলমাত্র প্রধানমন্ত্রীর ইঙ্গিতেই করা হয়েছে। যা ভোটের রাজনীতিতে ধর্মের অবস্থানকে স্পষ্ট করতে পেরেছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন ইসলামপন্থী সংগঠনগুলো বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা এ দেশে হিন্দু জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা কমতে কমতে ছয় শতাংশে নেমে এসেছে যা সত্তরের দশকে ছিল প্রায় পঁচিশ/ছাবি্বশ শতাংশ। বিগত নির্বাচনগুলোতে হিন্দু জনসমষ্টি আওয়ামী লীগকে ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে দিতে পারলেও সামনের নির্বাচনে সেটা করতে পারবে বলে মনে হয় না। কারণ একদিকে হিন্দু জনসংখ্যার ক্রম অবনতি অন্যদিকে আওয়ামী সদস্য কর্তৃক নিজেদের ঘরবাড়ি জায়গা-জমি বেদখল হওয়াতে আওয়ামী লীগের প্রতি আস্থা সংকটে ভুগতে থাকা হিন্দুদের ওপর আওয়ামী লীগ আর নির্ভরশীল হতে পারবে না। তাছাড়া ইসলামপন্থী জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যে কোনো সময় এবং যেকোনো সমপ্রদায়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বৃদ্ধি পেতে চলেছে। কাজেই নির্বাচনে জিততে হলে ইসলামি সংগঠনগুলোকে সঙ্গে না রাখার বিকল্প আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কেউই দেখছে না। সুপ্রিম কোর্টের ভাস্কর্য এখন সেই রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের শিকার হয়েছে।

বিএনপি ভেবেছে যে, ভাস্কর্য অপসারণ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে হয়েছে এটা যদি ইসলামপন্থী সংগঠনগুলো মনে করতে থাকে তাহলে প্রধানমন্ত্রীকে ইসলামপন্থীদের কাছে ইসলাম বিদ্বেষী হিসেবে সাব্যস্ত করানো মুশকিল হতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে ইসলামপন্থী সংগঠনগুলোকে আওয়ামী লীগ সহজেই কব্জায় নিতে পারে। সে জন্যই বিএনপি বলতে শুরু করেছে যে ভাস্কর্য অপসারণ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে হয়নি, হয়েছে আদালতের নির্দেশে। যাতে ইসলামপন্থীরা প্রধানমন্ত্রীকে বিশ্বাস করতে না পারে। আর আওয়ামী লীগ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের ব্যানারে জমায়েত হওয়া লোকদের কাছে আস্থাশীল থাকার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের ওপর দায় চাপিয়েছে। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ চেক এন্ড ব্যালান্সের কৌশল গ্রহণ করেছে।

বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন স্থাপত্যের অঙ্গনে ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার মোড়ে মোড়ে যখন অসংখ্য ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে তখন সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে স্থাপিত দেবী থেমিসের ভাস্কর্যটি ইসলামি সংগঠনগুলোকে উদ্বিগ্ন করল কেন সেটি ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে। বাংলাদেশের আইন-আদালত ইসলামি অনুশাসন মেনে চলে না। আইন-আদালত এবং এর কলাকুশলী সবই গড়ে উঠেছে ইংরেজ চরিত্র অনুকরণে। এমন পরিবেশে দেবী থেমিসের ভাস্কর্য কোন যুক্তিতে বেমানান তা ইসলামি সংগঠনগুলোর ব্যাখ্যায় পরিষ্কার হয়ে ওঠেনি। যেখানে সব আইন-আদালতই ইসলামি ভাবধারার বাইরে তার কার্যক্রম পরিচালিত করে আসছে সেখানে ইসলাম পরিপন্থী কী স্থাপন করা হচ্ছে বা হচ্ছে না সেটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে না। যদি ইসলামি মূল্যবোধ নিয়ে এ দেশের আইন-আদালত গড়ে উঠত তাহলে এমনিতেই কোনো পক্ষই সেখানে দেবী থেমিসের ভাস্কর্য সংযুক্ত করতে যেত না।

আদালত চত্বর থেকে ভাস্কর্য অপসারণ হয়নি, শুধু স্থানান্তরিত হয়েছে। আইন-আদালতের চেয়ে মানুষের মৌলিক অধিকারের বিষয় হলো শিক্ষা। এ দেশের বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙ্গিনায় যেসব ভাস্কর্য রয়েছে যেসব ভাস্কর্যের ব্যাপারে ইসলামি সংগঠনগুলোর ব্যাখ্যা পরিষ্কার হয়নি কিন্তু সরকারের মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের পরিষ্কার করে বলেছেন মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য যেমন আছে তেমন থাকবে এবং প্রয়োজনে আরো ভাস্কর্য তৈরি হতে পারে।

প্রাচীনকালে মানুষ এক ঈশ্বরের বহুমাত্রিক রূপ কল্পনা করে নিত। সে সময়ে মানুষ ঈশ্বরের এক একটি রূপকে এক একটি দেবতা ভেবে সেই দেবতার মূর্তি বা ভাস্কর্য তৈরি করে তার অর্চনা করত। দেবালয় বা মন্দির স্থাপন করে সেখানে মূর্তিগুলোকে সংরক্ষণ করে রাখা হতো। বিপদাপদের প্রকার ভেদে মানুষ ভিন্ন ভিন্ন দেবালয়ে গিয়ে মূর্তির পায়ে ফুলজল দিয়ে পূজা করে বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দেবতার আশীর্বাদ প্রত্যাশা করত। এভাবেই মধ্যযুগ পর্যন্ত ধর্মনির্ভর দেবদেবীর রূপকল্পে মূর্তিসংস্কৃতির এই ধারাটিই বিস্তার লাভ করেছে। আধুনিক বিশ্বে ভাস্কর্য বা মূর্তি ধর্মের গ-ি পেরিয়ে বিভিন্ন বিষয়কে ধারণ করে গড়ে উঠেছে। আধুনিক ভাস্কর্যের বিষয় হয়েছে ব্যক্তি মানুষের ব্যক্তিগত ভাবানুভূতি থেকে শুরু করে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক যে কোনো ভাবাবেগ। সে জন্য ভাস্কর্য এখন আর দেবদেবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জীবন ও সমাজের ব্যর্থতা, সফলতা, কৃতিত্ব, বীরত্ব ইত্যাদি মোটিভকে ভাস্কযের্র মাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে। এসব ভাস্কর্যকে কেউ ফুলজল দিয়ে পূজা অর্চনা এবং অতি ভক্তিও করে না। যেমন স্টাচু অব লিবার্টি এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্যগুলো। এসব ভাস্কর্যকে দেবদেবীর ভাস্কর্যের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা যায় না। এসব ভাস্কর্যের ব্যাপারে ইসলামের পরিষ্কার ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে। ইসলামে মূর্তি নিষিদ্ধের নির্দেশটি এসেছে আল্লাহর একত্ববাদের সঙ্গে অংশীদারিত্বের বিষয় থেকে। হজরত ইব্রাহিম (আ.) যেসব মূর্তি ভেঙেছিলেন সেসব মূর্তি ছিল দেবদেবীর মূর্তি। যেগুলোকে খোদা হিসেবে মান্য করা হতো। হজরত মুহাম্মদ (সা.) কাবাঘর থেকে যে ৩৬০টি (ছোট বড় মিলে) মূর্তি অপসারণ করেছিলেন তার সবকটিই ছিল দেবদেবীর মূর্তি। এসব মূর্তির সঙ্গে আল্লাহর অংশীদারিত্বের সম্পর্ক ছিল বলে মানুষ বিশ্বাস করত। মানুষের এ বিশ্বাসকে ভেঙে দেয়ার জন্যই মুহাম্মদ (সা.) মূর্তিগুলো অপসারণ করেছিলেন। তবে সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে স্থাপন করা মূর্তিটি দেবী থেমিসের। গ্রিক সভ্যতার মানুষ এই দেবীকে ন্যায়বিচারের একমাত্র ধারক-বাহক মনে করত। তারা মনে করত ন্যায়-অন্যায়ের ক্ষমতা ঈশ্বরের নেই যা এই দেবী থেমিসের কাছে রয়েছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ন্যায়বিচারের একমাত্র ক্ষমতাধর শক্তি হিসেবে দেবী থেমিসের ওপর বিশ্বাস রাখে না। এদেশের মানুষ মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে যে, শুধুমাত্র ঈশ্বরই ন্যায়বিচার করতে পারেন। জনগণের এ বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গেলে দেবী থেমিসের ভাস্কর্যটি সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে যুক্ত করার অগ্রাধিকার রাখে না। সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে যদি কোনো ভাস্কর্য রাখতেই হয় তাহলে এ দেশের সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যায় এমন কোনো থিম অথবা বাংলাদেশের আইন-আদালতের ব্যাপারে যথেষ্ট অবদান রেখেছে এমন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্মারক ভাস্কর্য রাখতে পারলে বিতর্ক এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হতো।
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
আজকের নামাজের সময়সূচীসেপ্টেম্বর - ২২
ফজর৪:৩২
যোহর১১:৫২
আসর৪:১৪
মাগরিব৫:৫৮
এশা৭:১১
সূর্যোদয় - ৫:৪৭সূর্যাস্ত - ০৫:৫৩
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
২৫৯১৬.০
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদক : আহ্সান উল্লাহ্। প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ৯৩৫৭৭৩০ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ djanata123@gmail.com, bishu.janata@gmail.com
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.