নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, শুক্রবার ১৩ অক্টোবর ২০১৭, ২৮ আশ্বিন ১৪২৪, ২২ মহররম ১৪৩৯
কিশোরগঞ্জের বড়ইতলায় ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যায় শহিদ হয় ৩৬৫ জন
কিশোরগঞ্জ থেকে মো. নাজিম উদ্দিন
দাঁড়াও পথিক বর, জন্ম যদি তব এ বঙ্গে- তিষ্ট ক্ষণকাল বড়ইতলা গণহত্যায় শহিদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধের ফলকে লেখা মাইকেল মধুসূদন দত্তের বিখ্যাত কবিতার এ লাইন দু'টি দৃষ্টি আকর্ষণ করে যে কোনো দেশপ্রেমিক সাধারণ মানুষের। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মানুষ ফিরে যায় সেই রক্তাক্ত ভয়াল দিনে। ১৯৭১ সনের ১৩ অক্টোবর বড়ইতলা গণহত্যা দিবস (বর্তমান নাম শহীদনগর)। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এই দিনে কিশোরগঞ্জের বড়ইতলা গ্রামে পাকবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত হয় ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম ও নৃশংসতম গণহত্যা। গণহত্যায় একই সঙ্গে হত্যা করা হয় ৩৬৫ জন নিরীহ মানুষকে এবং আহত হয় আরও দেড় শতাধিক। সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া লোকজন গণহত্যার ভয়াবহ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আজও আতংকে শিউরে উঠেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও অন্যান্য সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ১৩ অক্টোবর সকালে একদল পাকসেনা ট্রেনযোগে কিশোরগঞ্জ জেলা সদরের নিকটবর্তী কর্শাকড়িয়াইল ইউনিয়নের বড়ইতলা গ্রামে আগমন করে। উদ্দেশ্য ছিল বড়ইতলাসহ আশেপাশের গ্রামের মানুষজনকে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ও পাকিস্তানের পক্ষে সংঘটিত করা। কিন্তু বড়ইতলা গ্রামে প্রবেশের পর পথ হারিয়ে একজন পাকসেনা দলছুট হয়ে পড়ে। কথিত উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি চলাকালে নিজেদের দলের একজন সদস্যের স্বল্পতার বিষয়টি পাকসেনা কর্মকর্তাদের নজরে আসে। এ সুযোগে স্থানীয় রাজাকাররা পাকবাহিনীর নিকট এই মর্মে গুজব রটিয়ে দেয় যে, গ্রামবাসীরা পাকসেনাকে গুম করে ফেলেছে। এ সংবাদের সত্যতা যাচাই না করেই পাকবাহিনী উন্মত্ত পশুর হিংস্রতা নিয়ে গ্রামবাসীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। পাকসেনা ও তাদের স্থানীয় দোসররা বড়ইতলা, চিকনিরচর, দামপাড়া, কালিকাবাড়ি, কড়িয়াইল, তিলকনাথপুর, গোবিন্দপুর ও ভূবিরচর গ্রামের পাঁচ শতাধিক লোককে ধরে এনে কিশোরগঞ্জ-ভৈরব রেল লাইনের পাশে বড়ইতলা গ্রামের একটি স্থানে জড়ো করে। এক পর্যায়ে জড়ো হওয়া গ্রামবাসীদের লাইন করে দাঁড় করিয়ে পাকসেনারা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে, রাইফেলের বাট দিয়ে পিটিয়ে ও গুলি করে শুরু করে নির্মম হত্যাযজ্ঞ। বর্বর এ হত্যাযজ্ঞে ৩৬৫ জন শহীদ এবং আরও দেড় শতাধিক ব্যক্তি আহত হন।

স্বাধীনতার বহু বছর পর বড়ইতলার গণহত্যার ঘটনায় শহিদদের স্মরণে উক্ত স্থানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ২০০০ সনে জেলা পরিষদের উদ্যোগে ৬৬৭ বর্গফুট এলাকা জুড়ে ২৫ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট স্মৃতিসৌধটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। স্মৃতিসৌধটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম (বর্তমান জনপ্রশাসন মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য) এবং নকশা প্রণয়ন করেন সজল বসাক।

কি ঘটেছিল ১৯৭১ সালের ১৩ অক্টোবর- একথা জানতে মুখোমুখি হই সেদিনের গণহত্যার ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ও প্রত্যক্ষদর্শী কয়েক গ্রামবাসীর। যাদের অনেকেই অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছেন গণহত্যা থেকে। অনেকেই হারিয়েছেন নিকটতম স্বজনদের। যারা আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন সেই ভয়াল দিনের দুঃষহ স্মৃতি।

দামপাড়া গ্রামের বাসিন্দা স্থানীয় শিক্ষক আজিজুল হক বলেন, ১৩ অক্টোবর এখানে নির্মম হত্যাকা- সংঘটিত হয়। শত শত লোককে পাকবাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে। আমার বাড়ি থেকেও ২ চাচা ও চাচাত ভাইসহ মোট ৩ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। গণহত্যায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া দামপাড়া গ্রামের অপর বাসিন্দা আলী আকবর বলেন, ১৯৭১ সনের ১৩ অক্টোবর এখানে পাকবাহিনী কয়েক হাজার লোক জড়ো করে। এর মধ্যে আমিসহ আমার বাড়ির কয়েকজন লোকও এখানে জড়ো হই। এরপর পাকবাহিনী গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে মানুষ হত্যা করে। আমার আপন চাচা, চাচাতো ভাই, ভাতিজাসহ ৪ জন মারা যায়। আমি অলৌকিকভাবে লাশের স্তুপের নিচে পড়ে গিয়ে রক্ষা পাই। পাকবাহিনী যাবার পর বের হয়ে আসি। দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত মরা লাশের নিচে ছিলাম। গণহত্যায় সবচেয়ে বেশি মারা যাওয়া চিকনিরচর গ্রামের বাসিন্দা ফিরোজ উদ্দিন বলেন, সংগ্রামের সময় পাকবাহিনী বড়ইতলায় সাড়ে ৩শ লোক হত্যা করে। আমাদের এলাকা থেকে ৩৫ জন এবং আমাদের গোষ্ঠী থেকে আমার পিতাসহ ৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনার কোনো বিচার হয়নি এবং কোনো সাহায্যও পাইনি। গণহত্যায় বেঁচে যাওয়া চিকনিরচর গ্রামের বাসিন্দা জিল্লুর রহমান বলেন, পাকবাহিনী এসে আমাদের ধরে নিয়ে যায়। অনেক লোকজন একসঙ্গে জড়ো করে লাইন করে দাঁড় করিয়ে গুলি ছুড়ে লোক মারা শুরু করে। আমি লাশের স্তুপের নিচে পড়ে রক্ষা পাই। পাকবাহিনী যাওয়ার পর লোকজন আমাকে বের করে আনে।

গণহত্যার ঘটনায় বেয়নেটের আঘাতে আহত হয়ে বেঁচে যাওয়া চিকনিরচর গ্রামের মনতাজ উদ্দিন বলেন, পাঞ্জাবিরা আমাকে ও আমার ভাইকে রাস্তা থেকে ধরে বড়ইতলা নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে বেয়নেট দিয়ে মাথায় আঘাত করে। পরে আমি মারা গেছি মনে করে ফেলে রেখে যায়। পুরো একদিন আমি লাশের স্তুপের মধ্যে পড়েছিলাম। পর দিন একজন মহিলা আমাকে লাশের স্তুপ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। কালিকাবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা মোঃ রুকন উদ্দিন বলেন, বড়ইতলা গণহত্যা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নৃশংস ঘটনা। এই ঘটনার সংবাদ তখন বিবিসিতে প্রচারের পর বিশ্ববাসীর বিবেকে টনক নড়ে এবং মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ত্বরান্বিত হয়। উক্ত গণহত্যায় সাড়ে ৩শ লোক নিহত হয় এবং আমার পিতাসহ আমার পরিবারের ৫ জন নিহত হয়। প্রতিবছর ১৩ অক্টোবর বড়ইতলা ও আশেপাশের গ্রামের লোকজন বেদনাবিধুর চিত্তে স্মরণ করে সেদিন সংঘঠিত ইতিহাসের অন্যতম বর্বরতম গণহত্যার কথা। গণহত্যায় হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের কথা স্মরণ করে আজও চোখের পানি ফেলে তাদের স্বজনরা।

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
এই পাতার আরো খবর -
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
আজকের নামাজের সময়সূচীমার্চ - ২৬
ফজর৪:৪১
যোহর১২:০৫
আসর৪:২৯
মাগরিব৬:১৫
এশা৭:২৮
সূর্যোদয় - ৫:৫৭সূর্যাস্ত - ০৬:১০
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
৪৪৬৭.০
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদক : আহ্সান উল্লাহ্। উপদেষ্টা সম্পাদক : মোঃ শাহাবুদ্দিন শিকদার। প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ৯৩৫৭৭৩০ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ djanata123@gmail.com, bishu.janata@gmail.com
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.