নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, শুক্রবার ১৩ অক্টোবর ২০১৭, ২৮ আশ্বিন ১৪২৪, ২২ মহররম ১৪৩৯
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে বিজ্ঞানী বেশে বিপ্লবী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়
অ্যাডভোকেট এম. মাফতুন আহম্মেদ
দেশ থেকে দেশান্তরে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে বটবৃক্ষের ন্যায় কিছু মানুষের আগমন ঘটে। তারা একটি জনপদকে ছায়া দিয়ে রাখেন। তারা সৃষ্টিশীল কর্মের মাধ্যমে জাতীয়-আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশ-জনপদের পরিচিতি তুলে ধরেন। মেধা মননের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে দেশে দেশে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। তাই তাদের বলা হয় কৃতি পুরুষ;জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। যুগে যুগে দেশে দেশে এভাবে শ্রেষ্ঠ সন্তানদের আগমন ঘটে। যুগ ঐতিহাসিক সেসব শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন হলেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। ডাক নাম ফুলু। একজন খাঁটি বাঙালি। জগৎখ্যাত বিজ্ঞানী। যিনি গোটা ভারতবাসীর অহংকার। খুলনাবাসীর পরম সম্পদ। তাকে উপেক্ষা করে অখ- ভারতের ইতিহাস রচনা হতে পারে না। তেমনি লাল সবুজের পতাকায় আচ্ছাদিত এই স্বাধীন তল্লাটের সত্যিকার কৃতি পুরুষদের ইতিহাস লিখতে গেলে সর্বাগ্রে তার নাম চলে আসে। এখন প্রশ্ন হলো কী লিখবো তার সম্পর্কে;কোন বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে। অপূর্ব মেধা-মননের মানুষ এই মনীষী সম্পর্কে ক্ষুদ্র জ্ঞান আর ভোতা ছুরি দিয়ে কিছু লেখার স্পর্ধা আমার জ্ঞান ভা-ারে আপাতত নেই। তাই স্বল্প জ্ঞান আর বিবেক বুদ্ধি দিয়ে কিছু একটা লিখতে ইচ্ছে হয়, তাই লিখছি। সব মানুষের মধ্যে বিবিধ গুণ লক্ষ্য করা যায় না। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রমধর্মী ব্যক্তি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হয়ে উঠেন। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ছিলেন সেই ব্যতিক্রমধর্মী ব্যক্তিদের একজন। একদিকে তিনি ছিলেন সফল শিক্ষক, জগৎখ্যাত বিজ্ঞানী, শিল্প উদ্যোক্তা, রাজনীতিক, সমবায় আন্দোলনের পুরোধা, একজন সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক, কবি, শিল্পী ও রাজনীতিবিদ। সিংহ হৃদয় এই মানুষটির জীবন ছিলো নানান বৈচিত্রে ভরা। যে যুগে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন তখন ছিলো বর্ণভেদ এক সমাজ ব্যবস্থা। চলছিল বর্ণ হিন্দু জমিদার বাবুদের নির্মম নির্যাতন। অথচ একজন কায়স্ত পরিবারের জমিদারের সন্তান হয়েও তিনি অসম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন। জাত-পাতের ঊধর্ে্ব থেকে সকল সম্প্রদায়ের মানুষকে তিনি হৃদয় দিয়ে ভালোবাসতেন। অনেকে জানেন তিনি ছিলেন শুধুমাত্র একজন বিজ্ঞানী। একজন কাটখোট্টা জীর্ণ-শীর্ণ মানুষ। গবেষণালব্ধ জীবনই তার পরম আরোধ্য। অথচ একজন খাঁটি বাঙালি হিসেবে তিনি বাঙালির আর্থিক দুর্দশা, বাঙালির দীনতা, বাঙালির চরিত্রের দুর্বলতা কেন্দ্রিক তার ভাবনা ছিলেন নিরন্তর। সর্বোপরি ভারতবাসীর ভাগ্য পরিবর্তনে ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন এক প্রতিবাদী সিংহ পুরুষ।

আগেই বলেছি তিনি ছিলেন ইতিহাসের এক ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব। মেধা মননের মানুষ। ছিলেন জ্ঞানের মহা সমুদ্র। জ্ঞানের ভুবনে অতল সমুদ্রে এপার থেকে ওপার পর্যন্ত তিনি নির্বিঘ্নে পাড়ি দিয়েছেন। জীবনের পদে পদে সফলতার স্বাক্ষর বহন করেছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে একজন সফল বিজ্ঞানী হিসেবে সবাই তাকে চেনে। বিজ্ঞানীর লেবাসে আসলে তিনি ছিলেন প্রকৃত দেশপ্রেমিক একজন রাজনীতিক; আমরা অনেকে তা জানি না। তিনি কত বড় জাতীয়তাবাদী ছিলেন, ব্রিটিশের বিরুদ্ধে কত বড় প্রতিবাদী ছিলেন এ বিষয়ে সর্বোচ্চ শক্তি সামর্থ দিয়ে আলোচ্য প্রবন্ধটি উপস্থাপনের চেষ্টা করবো।

এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, বৃহত্তর যশোর-খুলনার মানুষের কাছে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় সত্যিই অহংকার। একজন গৌরবময় আলোকিত জাতীয় বীর। সরকারি-বেসরকারি প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই জাতীয় বীরের জন্ম-মৃত্যু বাষির্কী প্রতি বছর পালিত হয়। তবে দায় সারা গোছের। নিজের জেলা খুলনার মানুষ এই জ্ঞান তাপস সম্পর্কে তেমন একটা খবর রাখেন বলে মনে হয় না। প্রবাদে আছে- 'গোয়াল ধারের ঘাস গরুতে খায় না'। প্রসঙ্গত 'আলোকিত বৃহত্তর খুলনা জেলা' নামে বেশ কিছুদিন আগে একটি বই পড়েছিলাম। সে বইটিতে আচার্যদেবের কোনো নাম নেই। নাম নেই বৃহত্তর খুলনার অনেক খ্যাতিমানদের। আমার কাছে এসব ধৃষ্টতা। হয়তো এই বইয়ের লেখকের কাছে এসব ছিলো তার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির এক দূরদর্শিতা। তবুও বইটির লেখককে এই ব্যাপারে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম এসব কিংবদন্তীদের বাদ দিয়ে কী খুলনা আলোকিত হতে পারে? মতলববাজ এই লেখক সন্তোষজনক কোনো জবাব দিতে পারেননি। তিনি খুলনাকে আলোকিত না করে গহীন এক অন্ধকারের দিকে নিয়ে গেছেন। ইতিহাস বিকৃতির এক ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন। অখ্যাতদের কেনাবেচা করে সমাজের কাছে খ্যাত করার চেষ্টা করেছেন। উল্লেখ্য এই বইটির সফলতা-ব্যর্থতা লেখক দেখে যেতে পারেননি। বইটি প্রকাশের কিছুদিন পর তিনি পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। ইতিহাসের কিংবদন্তী এসব জগৎ বিখ্যাতদের যথার্থ মূল্যায়ন করতে না পারা বৃহত্তর খুলনাবাসীর জন্য ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া কিছুই না। আচার্যদেব ঠুনকো কোনো ব্যক্তি নন। ইতিহাসের পাতায় ক্ষণজন্মা এক ব্যক্তিত্ব। পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম একজন বাঙালি বিজ্ঞানী। ইতিহাসের পাতা ঘেটে ঘেটে জেনে নেয়া যাক আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় সম্পর্কে তথ্যবহুল দুর্লভ কিছু ঘটনা।

প্রেম রসায়নে ওগো সর্বজন প্রিয়

জগৎখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার পি.সি. রায় সততা, নিষ্ঠা এবং অধ্যবসায়ের গুণে গোটা বিশ্বে নিজেকে আলোকিত করেছিলেন। স্বজাতি বাঙালির আত্ম মর্যাদাকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছিলেন। ইতিহাস খ্যাত এই জ্ঞান তাপস এককালের স্রোতস্বীনী শিবসা-কপোতাক্ষ নদের তীর ঘেঁষা কাঁঠাল স্বাদে-গন্ধে ভরা বিখ্যাত খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার ছায়া ঢাকা রাড়ুলী গ্রামে ১৮৬১ সালের ২ আগস্ট (১২৬৮ সন, ১৮ শ্রাবণ বঙ্গাব্দ) পিতা হরিশচন্দ্র রায়ের ঔরসে ও মাতা ভুবন মোহনী দেবীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা হরিশ চন্দ্র ছিলেন আরবি, ফার্সি ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষ একজন ছোটখাটো জমিদার। উল্লেখ্য যে, স্যার পি.সি.রায় যখন জন্মগ্রহণ করেন আজকের বিভাগীয় শহর খুলনা তখন ছিলো যশোহর জেলার অধীন ছোট একটি মহাকুমা মাত্র।

তার জন্ম গৌরবে শুধু তার জন্মভূমি দক্ষিণ খুলনার অবহেলিত জনপদ পাইকগাছার উপজেলার রাড়ুলী গ্রামই ধন্য হয়নি। বরং সমগ্র ভারত বর্ষের মানুষ তার জন্ম গৌরবে গৌরবান্বিত। পি.সি. রায় ছিলেন একজন ব্যতিক্রমধর্মী আলোকিত মানুষ। তিনি নিজেই নিজের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে-'আমি বৈজ্ঞানিকের দলে বৈজ্ঞানিক, ব্যবসায়ী সমাজে ব্যবসায়ী, গ্রাম সেবকদের সাথে গ্রাম সেবক আর অর্থনীতিবিদদের মহলে অর্থনীতিজ্ঞ'। ছোট বেলাতেই প্রফুল্ল চন্দ্রের মেধার বিকাশ ঘটে। বই পড়ার নেশায় অনেক সময় তার খাবারে অনিয়ম হতো। গ্রামের পাঠশালায় প্রথমে লেখাপড়ার হাতেখড়ি। পিতার প্রতিষ্ঠিত এম.ই স্কুলে ৯ বছর বয়স পর্যন্ত লেখাপড়া করে উচ্চতর শিক্ষার জন্য পিতা-মাতার সাথে কলকাতায় গমন করেন। ১৮৭১ সালে কলকাতা হেয়ার স্কুলে ভর্তি হন। ১৮৭৬ সালে কলকাতায় কেশব চন্দ্র সেন প্রতিষ্ঠিত আলবার্ট স্কুলে ভর্তি হন। এখান থেকে ১৮৭৯ সালে প্রফুল্ল চন্দ্র প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৮৮১ সালে দ্বিতীয় বিভাগে এফ এ পাস করে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে বি.এ ক্লাসে ভর্তি হন। এ সময় গিলক্রাইস্ট বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। এ বছর বাংলার প্রফুল্ল চন্দ্র ও বোম্বাই-এর বাহাদুরজী নামে দু'ছাত্র গিলক্রাইস্ট বৃত্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ৩৩ দিন জাহাজে যাত্রার পর তিনি ইংল্যান্ডে পৌঁছে ১৮৮২ সালে এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা, রসায়নশাস্ত্র ও প্রাণিবিদ্যা নিয়ে বি.এস.সি ক্লাসে ভর্তি হন। ১৮৮৫ সালে তিনি কৃতিত্বের সাথে বি.এস.সি পাস করে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য গবেষণা শুরু করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিলো 'অনপিরিয়ডিক ক্লাসিফিকেশন অফ এলিমেন্টস'। ১৮৮৭ সালে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি রসায়ন শাস্ত্র নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন। তার মধ্যে ডুবে থেকেছেন। অতঃপর দেশ জাতিকে নিয়ে ভেবেছেন। তাই ১৯৩২ সালে ১১ ডিসেম্বর কলকাতা টাউন হলে তার সত্তর বছর পূর্তি উপলক্ষে সভাপতির ভাষণে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আচার্যদেবের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছিলেন:

'প্রেম রসায়নে ওগো সর্বজন প্রিয়

করিলে বিশ্বের জনে আপন আত্নীয়'।

বিজ্ঞানী বেশে বিপ্লবী

একজন বিজ্ঞানীর থাকার কথা গবেষণাগারে। অথচ আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় দেশ জাতিকে নিয়ে ভাবতেন। ব্রিটিশ রাজের অধীনে চাকরি করেও এক স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন দেখতেন। তাই তিনি অকুতোভয়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি নিজের ভাষায় লিখেছেন-'আমি বৈজ্ঞানিক, গবেষণাগারেই আমার কাজ, কিন্তু এমন সময় আসে যখন বৈজ্ঞানিককেও দেশের আহ্বানে সাড়া দিতে হয়'। তার এক বিখ্যাত ভাষণে তিনি বলেছিলেন-'ঝপরবহপব পধহ ধিরঃ নঁঃ ঝধিৎধল পধহ্থহ------' দেশের জন্য প্রয়োজন হলে বিজ্ঞানীকে টেস্টটিউব ছেড়ে গবেষণাগারের বাইরে আসতে হয়। বিজ্ঞানের গবেষণা অপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু স্বরাজের জন্য সংগ্রাম অপেক্ষা করতে পারে না। মহাত্মা গান্ধী, গোখেলে, জিন্নাহ প্রভৃতি নেতাদের মতো তিনি পেশাদারি রাজনীতিবিদ না হয়েও সত্যিকার দেশপ্রেম তাকে তাদের সমপর্যায়ে উন্নীত করে। রাজনীতিকে তিনি দেশ জাতির সেবার একটি বিশেষ অংশ হিসেবে দেখেছেন। তিনি শ্লোগান সর্বস্ব চাপাপিটানো রাজনীতিকে বিশ্বাস করতেন না। এ জন্য পেশাদার রাজনীতিবিদদের চটকদার বক্তব্য থেকে নিজেকে সব সময় দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। দেশ সেবায় অংশ গ্রহণ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন রাজনীতিতে সুস্থ চিন্তা ধারার প্রতিফলন না ঘটলে গোটা দেশের শিল্প ও বিজ্ঞানের কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ কারণে যারা দেশের জন্য সত্যিকার রাজনীতি করতেন তিনি তাদের পেছনে থেকে তাদের অনুসৃত সংগ্রাম ও আন্দোলনে সহযোগিতা করেছেন।

আমাদের মুক্তি সংগ্রামের দু'জাতীয় বীর যতীন্দ্র মোহন, সুভাষ বসু প্রমুখ নেতৃবৃন্দ তখন আলীপুর জেল কারাগারে। তারা তখন অন্ধকার কারা প্রকোষ্টে ব্রিটিশদের হাতে নির্মম অত্যাচারের শিকার। এসব লোমহর্ষক ঘটনা দেখে সেদিন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় তার গবেষণাগারে বসে ছিলেন না। সব ছেড়ে দিয়ে অত্যাচারী ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। মিশে গিয়েছিলেন জনতার কাতারে। জনসভায় দাঁড়িয়ে তিনি দিপ্ত কণ্ঠে ব্রিটিশ দুঃশাসনের বিরুদ্ধে হুংকার দিয়েছিলেন। দৃঢ়তার সাথে উচ্চারণ করেছিলেন-'আমি একজন কেমিস্ট;টেস্টটিউব ফেলে দেশপ্রেমিকদের প্রতি অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে এসেছি'। জালিয়ানওয়ালাবাগে নিরীহ দেশপ্রেমিক ভারতীয়দের নৃশংস হত্যাকা-ে তাকে গভীর ভাবে পীড়িত করে। তখন 'রাউলাট আইন' অনুসারে পুলিশ যে কোনো ভারতীয়কে গ্রেফতার ও বিনা বিচারে আটক রাখতে পারবে। এই আইন পাস হলে এর প্রতিবাদে ১৯১৯ সালে কলকাতা টাউন হলে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের সভাপতিত্বে তিনি যে বক্তৃতা করেন তা আজও ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে আছে। তিনি সেদিন একজন বিজ্ঞানী হয়েও ব্রিটিশ দুঃশাসনের জিঞ্জির থেকে ভারতীয়দের মুক্তির প্রত্যাশায় দৃপ্তকণ্ঠে বলেছিলেন-'এমন সময় আসে যখন বৈজ্ঞানিককে গবেষণা ছাড়িয়ে দেশের আহ্বানে সাড়া দিতে হয়'।

আসলে তিনি ছিলেন ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের কাছে একজন বিপ্লবী। রাজনীতি বলতে তিনি দেশপ্রেমের কথা বলতেন, মানুষের মুক্তির কথা বলতেন, জাতীয়তাবাদের কথা বলতেন। বলতেন গোটা ভারতীয়দের মুক্তি সংগ্রামের কথা। বলতেন তাদের যাবতীয় দুঃখ-দুর্দশা মোচনের কথা। তার সম্পর্কে তৎকালীন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার মন্তব্য করেছিলেন-'স্যার পি.সি. রায়ের মতো লোক যদি অর্ধ ডজন থাকতো, তা হলে দেশ এতদিন স্বাধীন হতো'। তিনি দেশের স্বার্থকে সব সময় বড় করে দেখেছেন। ছাত্রবস্থায় একবার রচনা প্রতিযোগিতায় তিনি ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে কলমের ঝঙ্কার তুলেছিলেন। একটি প্রবন্ধে 'সিপাহি বিদ্রোহের আগে ও পরে' বিষয়ক এক রচনা প্রতিযোগিতায় তিনি অংশ নেন। ব্রিটিশ সরকারের ভ্রান্ত নীতির ফলে ভারতে 'সিপাহি বিদ্রোহ' সংগঠিত হয়। তিনি এর জন্য ব্রিটিশ সরকারকে সরাসরি দায়ী করেন। উল্লেখ্য যে তিনি কত দুঃসাহসিকতর পরিচয় দিয়েছিলেন যে, সরকারি বৃত্তি বন্ধ হবার আশঙ্কা সত্ত্বেও তিনি ভারতের জনগণের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরতে মোটেই ভুল করেননি। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় প্রথম পর্যায়ে স্বদেশি আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ না করলেও বিপ্লবী বীরদের প্রতি তার ছিলো গভীর সহানুভূতি। তিনি মনে করতেন হাজতবাস হলে দেশীয় শিল্প ও বিজ্ঞানের ক্ষতি হতে পারে এমন ভাবনা থেকে পরোক্ষভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনে বিপ্লবীদের সাহায্য করতেন। তিনি বিজ্ঞানের সাধনা ছেড়ে পরাধীন মাতৃভূমির শৃঙ্খল ভাঙার জন্য উল্কার মতো বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক সভা ও সমিতির সভাপতিত্ব করে বিপ্লবের অগি্নশিখা ছড়িয়েছেন জনতার মাঝে। উল্লেখ্য যে, প্রসিদ্ধ মারাঠা রাজনীতিক গোপাল কৃষ্ণ গোখেলের সাথে ছিলো আচার্যদেবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ১৯০১ সালে বড়লাটের ব্যবস্থা পরিষদের অধিবেশনে যোগদানের জন্য মহামতি গোখেলে কলকাতায় আসেন। সাথে ছিলেন মহাত্মা গান্ধী। ১৯০২ সালের ১৯ জানুয়ারি আলবার্ট হলে (বর্তমান কফি হাউজ) এক সভার আয়োজন করা হয়। গান্ধীজী জনতার সামনে ভারতীয়দের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরেছিলেন। গান্ধীজীর মুখ থেকে ভারতীয় জনগণের মর্মস্পর্শী কথা শুনে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় মুগ্ধ হয়ে যান। বিশেষ করে ভারতীয় রাজনীতিতে অসাধারণ ব্যক্তিত্ব এবং যার ছিলো মানুষের প্রতি মমত্ব গান্ধীজীর আদর্শের প্রতি আচার্যদেব অনুপ্রাণিত হতে থাকলেন। এক পর্যায়ে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হলেন। পরাধীন ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সারা ভারত চষে বেড়াতে লাগলেন। মহাত্না গান্ধী ১৯২৫ সালের ১৭ জুন ব্রিটিশের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে অবিভক্ত বাংলার ডেপুটি স্পিকার সৈয়দ জালাল উদ্দিন হাসেমী ও অখ- বাংলার কংগ্রেসের অন্যতম নেতা ডুমুরিয়ার মাওলানা আহম্মদ আলীকে সাথে নিয়ে স্টিমার যোগে খুলনায় আসেন। এ সময় মহাত্মা গান্ধী ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য সারা ভারত সফর করতে লাগলেন। স্থানীয় খুলনা মিউনিসিপ্যাল পার্কে (আজকে শহিদ হাদিস পার্ক) সমাবেশের আয়োজন করা হয়। ভোরে স্টিমার ঘাটে স্যার পি.সি. রায় ও স্থানীয় কংগ্রেস নেতারা বিপুলভাবে মাল্যভূষিত করে তাদেরকে অভ্যর্থনা জানান। স্যার পি.সি. রায় ছিলেন এ সম্বর্ধনা কমিটির সভাপতি। সম্পাদক ছিলেন বিখ্যাত কংগ্রেস নেতা হেমন্ত নাথ ব্যানার্জী। উল্লেখ্য যে পরবর্তীতে গান্ধীর আগমনে খুলনা মিউনিসিপ্যাল পার্কটি গান্ধী পার্ক নামকরণ করা হয়। যদিও ঐ নামটি পরবর্তীতে টিকে থাকেনি। পালাবদলে নানা রাজনৈতিক কারণে পরিবর্তন হয়েছে। ঐ বছর কোকনাদ কংগ্রেসের কনফারেন্সে সভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ আলীর অনুপস্থিতে কিছু সময় স্যার পি.সি রায় সভাপতিত্ব করেন। দুর্ভাগ্য আমাদের মহান মুক্তি সংগ্রামের এই ত্যাগী পুরুষটি তার স্বপ্নের স্বাধীনতা নিজ চোখে দেখে যেতে পারেননি। তবে আমাদের মুক্তি সংগ্রামে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে তার অবদানকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ আছে বলে মনে করি না।

শুভ্র সমুজ্জ্বল এক ব্যক্তিত্ব

নশ্বর পৃথিবীতে মানুষ আজ আছে, কাল নেই। এটাই চিরন্তন সত্য। তবে সৃষ্টিশীল মানুষগুলো মরেও অমর। প্রকৃতির নিয়মনুযায়ী ১৯৪৪ সালে ১৬ জুন শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ছ'টায় কোনো উত্তরসূরী না রেখে ৮৩ বছর বয়সে কালের কপোলতলে এই জ্ঞান তাপসের জীবনাবসান ঘটে। শেষ জীবনে তার স্মৃতি শক্তি লোপ পেয়েছিল।

আগেই বলেছি আমাদের মুক্তি সংগ্রামে তার অবদানকে খাঁটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কারণ তিনি ছিলেন একজন জাতীয় বীর; পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের একজন। বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের একজন বীর সিপাহ্সালার। রক্তের আঁখরে লেখা এই স্বাধীন বাংলাদেশকে তিনি দেখে যেতে পারেননি। এ প্রসঙ্গে এক বিখ্যাত ইংরেজ বৈজ্ঞানিক আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় সম্পর্কে লিখেছিলেন,-'ভারতের মুক্তি হয়তো প্রফুল্ল চন্দ্রের জীবদ্দশায় হবে না-এই ক্ষীণকায় মানুষটির জীবন দেশের কাজে নিঃশেষ হয়ে যাবে কিন্তু অমর হয়ে থাকবে তার ত্যাগের দান'। কবির কল্পনা মিথ্যা হতে পারে না। বাস্তবায়ন হয়েছে। তবে বিলম্বে। ফিরিঙ্গি মুক্ত ভারত দেখার আগে তিনি পাড়ি দিয়েছেন না ফেরার দেশে। দেশের একজন সেরা বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিজীবী হয়েও জাতির সংকট মুহূর্তে নিজের জীবনকে অকাতরে বিলিয়ে দিতে কোন কৃপণতা করেননি। তাই তিনি সেদিন ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ব্রিটিশ দুঃশাসনের বিরুদ্ধে। মিশে গিয়েছিলেন সংগ্রামী জনতার কাতারে। সমকালীন ইতিহাসের পাতায় তিনি বিজ্ঞানীর বেশে বিদ্রোহী। এই তল্লাটের মানুষগুলোর ভাগ্য পরিবর্তনে তিনি নিরন্তর চিন্তা করতেন। বিপদে-আপদে তাদের পাশে ছুটে গিয়েছেন। তাই তার আদর্শকে অনুসরণ করি। তার আজীবন স্বপ্ন জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে রুখে একযোগে রুখে দাঁড়াই। তার আদর্শের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করি। তার সর্পিল বাংলাদেশ বিনির্মাণে এগিয়ে আসি।

অ্যাডভোকেট এম. মাফতুন আহম্মেদ : কলামিস্ট

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
আজকের নামাজের সময়সূচীনভেম্বর - ১৩
ফজর৫:১১
যোহর১১:৫৩
আসর৩:৩৮
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩৪
সূর্যোদয় - ৬:৩২সূর্যাস্ত - ০৫:১২
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
২৫৭১.০
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদক : আহ্সান উল্লাহ্। উপদেষ্টা সম্পাদক : মোঃ শাহাবুদ্দিন শিকদার। প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ৯৩৫৭৭৩০ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ djanata@dhaka.net
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.