নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, শুক্রবার ১২ অক্টোবর ২০১৮, ২৭ আশ্বিন ১৪২৫, ১ সফর ১৪৪০
মানসম্পন্ন শিক্ষার জন্য চাই মানসম্পন্ন শিক্ষক
মাছুম বিল্লাহ
এ বছর বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল 'শিক্ষার অধিকার মানে মানসম্পন্ন শিক্ষকের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করার অধিকার।' এটিকে আরো একটু ব্যাখ্যা করলে বোঝায়, কর্তৃপক্ষ তথা রাষ্ট্রকে তার ভবিষ্যৎ নাগরিকদের শিক্ষার জন্য প্রকৃত ও মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ বংশধররা প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে পরিবার, সমাজ ও দেশের প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যাচ্ছে, আসছে, বিদ্যালয়ে ভর্তি সংখ্যা বাড়ছে, পাসের হার বাড়ছে, বাড়ছে জিপিএ ৫ পাওয়ার হারও। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে প্রসারিত হচ্ছে শিক্ষা বাণিজ্যের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা, বিভিন্ন নামে। পাস করা শিক্ষার্থীদের যে হারে অ্যাকাডেমিক ও সামাজিক দক্ষতা অর্জন করার কথা, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তার দেখা মেলে না। তাই প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষার্থীরা কি মানসম্পন্ন শিক্ষা পাচ্ছে? মানসম্পন্ন শিক্ষা না পাওয়ার বড় একটি কারণ হচ্ছে মানসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব। সেই প্রেক্ষাপটে এবারকার প্রতিপাদ্যটি একেবারেই সময়োপযোগী।

আমরা জানি, ১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির প্রেক্ষাপটে ১৯৪৭ সালে ইউনেসকোর সাধারণ অধিবেশনে একটি শিক্ষক সনদ প্রণয়নের মধ্য দিয়ে শিক্ষক অধিকার সংক্রান্ত চিন্তার উন্মেষ ঘটে। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ২৬ অনুচ্ছেদে শিক্ষা মৌলিক অধিকার ও ব্যক্তিত্ব বিকাশে এর গুরুত্বের কথা আবারও আলোচনায় উঠে আসে। এরপর বিভিন্ন পদক্ষেপ ও কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। সেগুলোর ধারাবাহিকতায় ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে অনুষ্ঠিত বিশেষ আন্তঃরাষ্ট্রীয় সরকার সম্মেলনে ১৩ অধ্যায় বিন্যস্ত এবং ১৪৬টি ধারা-উপধারা সংবলিত শিক্ষকদের অধিকার, কর্তব্য ও মর্যাদা বিষয়ক ঐতিহাসিক 'ইউনেসকো আইএলও সুপারিশ ১৯৬৬' প্রণীত হয়। ওই ঐতিহাসিক দলিলে শিক্ষাকে দেশ, সমাজ ও জাঁতি গঠনের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করে শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার, মর্যাদা ও দায়দায়িত্বের বিষয়ও বিস্তারিতভাবে বলা হয়। পরবর্তী সময় শিক্ষকদের অধিকার ও মর্যাদা সম্পর্কিত সাফল্যকে সমুন্নত রাখাসহ আরো সমপ্রসারিত করার লক্ষ্যে ১৯৯৩ সালে বিশ্বের ১৬৭টি দেশের ২১০টি জাতীয় সংগঠনের প্রায় তিন কোটি ২০ লাখ সদস্যের প্রতিনিধিত্বকারী আন্তর্জাতিক শিক্ষক সংগঠন এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল গঠিত হয়। এই আন্তর্জাতিক সংগঠন জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত দেশগুলো কর্তৃক প্রণীত দলিলটি যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য দেশগুলোকে ক্রমাগত অনুরোধ ও আহ্বান করতে থাকে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৪ সালে ইউনেসকোর ২৬তম অধিবেশনে গৃহীত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ৫ অক্টোবর 'বিশ্ব শিক্ষক দিবস' পালনের সিদ্ধান্ত হয়।

আমাদের দেশে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি, শিক্ষকদের অর্থনৈতিক প্রণোদনা, বিনা মূল্যে বই বিতরণ, ছাত্রী উপবৃত্তিসহ শিক্ষাক্ষেত্রে নানা পরিবর্তন এসেছে ঠিকই; কিন্তু শিক্ষার মানের অগ্রগতি সেভাবে হয়নি। কোনো কিছুর সংখ্যা বাড়লে দ্রুত তার মানের বিষয়টি অ্যাড্রেস করা কঠিন হয়ে পড়ে, যদি উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়। বর্তমানে যে অবস্থা চলছে, তাতে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী তৃতীয় শ্রেণির পাঠ্য বই শুদ্ধভাবে পড়তে পারে না। এটি এক ধরনের লার্নিং ক্রাইসিস। পরীক্ষার ফল দেখে এ ক্রাইসিস বোঝা যায় না। শুধু সিলেবাস শেষ করাটা লার্নিং নয়। এ থেকে বেরিয়ে আসতে পরীক্ষা পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন দরকার। সৃজনশীল সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা বিরাজ করছে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সমগ্র শিক্ষা মহলে। সৃজনশীল প্রশ্নে শিক্ষার্থীদের নতুন করে তেমন কিছু দেয়া যায়নি। প্রশ্ন তারা এখনো গাইড বই থেকে, কোচিং থেকে শিখছে। এটিও বিরাট লার্নিং ক্রাইসিস। পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাই ফলভিত্তিক। তাই তারা প্রশ্ন কিভাবে আসে তার ওপরই প্রস্তুতি নেয়। ভাষা শিক্ষা, বিষয় শিক্ষা, চিন্তার পরিধি বৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয় একেবারেই উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। আমাদের শিক্ষণভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতির দিকে যেতে হবে। ফলভিত্তিক শিক্ষায় জ্ঞান অর্জন নিশ্চিত হয় না।

শিক্ষাকে রাজনৈতিকীকরণের ফলে শিক্ষার মানে প্রভাব পড়েছে, ঘটেছে বাণিজ্যিকীকরণ। পাঠদানবহির্ভূত অনেক কাজ করানো হয় প্রাথমিক শিক্ষকদের দিয়ে। তাঁরা যদি জরিপসহ অন্যান্য কাজ নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন, তাহলে ক্লাসরুমের কী হবে? এমনিতেই চরম শিক্ষক সংকট অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এভাবে মান রক্ষা করা কঠিন। তাঁদের যে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় তার কোনো ফলোআপ নেই। কাজেই ক্লাসে প্রশিক্ষণের বিষয়গুলো ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা দেখা প্রয়োজন। প্রয়োজন সাপোর্টিভ সুপারভিশন। অন্যদিকে শুধু বাজারমুখী শিক্ষা হলেও চলবে না। দর্শন ও দক্ষতার সমন্বয়েই শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য সত্যিকারের মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষ তৈরি করা। বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষাকে বাণিজ্যমুখী করা হয়েছে, এনজিও এ থেকে কিছুটা দূরে ছিল। তারাও এখন শিক্ষাকে বাণিজ্যিক পণ্য বানাতে চায়।

উপযুক্ত কারিকুলাম, যোগ্য শিক্ষক ও মানসম্মত পাঠ্য বই_এই তিনটি মানসম্পন্ন শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এগুলো নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেশ, সমাজ ও জনগণসহ সবার। পাবলিক পরীক্ষার ফল যেহেতু প্রকৃত মেধা নির্ণয়ের মাপকাঠি নয়, তাই উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভর্তি পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। তা না হলে ফলভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা, জিপিএ ৫-এর পেছনে ছোটাছুটি করা, বৈধ ও অবৈধ উপায়ে সেটি অর্জন করার প্রবণতা থেকেই যাবে। সৃজনশীল পদ্ধতি নিয়ে ভীতি কাটেনি। এটি শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষকদেরও ভীতির কারণ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের বড় অংশই অপ্রশিক্ষিত। এমনকি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও মানসম্পন্ন ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন শোনা যায়। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ২৯.৬৬ শতাংশ শিক্ষক প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাঠদান করছেন। প্রশিক্ষণ ছাড়াও বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান, উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ করতে না পারা, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শিক্ষক নিয়োগ ও এনটিআরসির দুর্নীতি মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের পথে অন্তরায়। আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়ে মেধার স্বাক্ষর রাখছে, অথচ দেশে তাদের মেধার পরস্ফুিটন হচ্ছে না বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে। এ প্রতিবন্ধকতাগুলো আমাদের দূর করতে হবে।

শিক্ষার মাধ্যমে একটি দেশের অন্য মুখ্য বিষয়গুলো কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত হয়। এজন্য সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার উৎকর্ষের বিষয়টি গভীরভাবে ভাবতে হবে। কারণ শিক্ষার উন্নয়ন সম্ভব না হলে রাষ্ট্রের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এটি সত্যি যে শিক্ষা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে অনেক বেশি। আবার এটিও সত্যি যে বর্তমান যুগের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার্থী আমরা অনেক ক্ষেত্রেই তৈরি করতে পারছি না।

শিক্ষার মান নির্ধারণের সঠিক কোনো মানদ- নেই। শিক্ষার মান যেখানে পৌঁছানো উচিত ছিল, সেই কাঙ্ক্ষিত মানে আমরা পৌঁছতে পারিনি_এটি বিভিন্ন লক্ষণ থেকে আমরা বুঝতে পারছি। শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, 'শিক্ষা মানবাধিকার, পণ্য নয়। সংবিধানে মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলা আছে। এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কনটেন্ট, ক্যাপাসিটি, কমিটমেন্ট_এই তিনটির সমন্বয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হবে। শিক্ষার্থীদের পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। বিভিন্ন দেশের আলোকে এঙ্পেরিমেন্টাল স্কুল চালু করা যেতে পারে। নিরাময়মূলক শিক্ষা চালু এবং শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি জোরদার করতে হবে, তাহলে শিক্ষণ দুর্বলতা দূর করা সম্ভব হবে।' মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিতকরণে মূল্যবোধ, নৈতিকতা, দেশপ্রেমযুক্ত আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা ব্যবস্থা দরকার। এজন্য প্রয়োজন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের যৌথ মিথস্ক্রিয়া।

আজ আর নতুন করে বলার অবকাশ নেই যে শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য শিক্ষকদের মানোন্নয়ন সবার আগে জরুরি। তাই শিক্ষকদের পড়াশোনা করতে হবে, শুধু পাঠ্য বইয়ের নির্দিষ্ট অংশ নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। তাঁদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন ফোরামে যোগদান করতে হবে, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে নিজেদের উপস্থাপন করতে হবে। শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের বর্তমান যুগের চাহিদা অনুযায়ী গড়ে তুলতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের বিকল্প নেই। এই সত্য প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রযোজ্য। কারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষণ মানের পুরোটা না হলেও বৃহদংশ নির্ভর করে শিক্ষকের যোগ্যতার ওপর, মানসম্পন্ন শিক্ষকের ওপর।

মাছুম বিল্লাহ : লেখক

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
আজকের নামাজের সময়সূচীঅক্টোবর - ১৬
ফজর৪:৪১
যোহর১১:৪৫
আসর৩:৫৪
মাগরিব৫:৩৫
এশা৬:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:৫৭সূর্যাস্ত - ০৫:৩০
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
২৬৯৮.০
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদক : আহ্সান উল্লাহ্। উপদেষ্টা সম্পাদক : মোঃ শাহাবুদ্দিন শিকদার। প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ৯৩৫৭৭৩০ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ djanata@dhaka.net
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.