নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, শুক্রবার ১২ অক্টোবর ২০১৮, ২৭ আশ্বিন ১৪২৫, ১ সফর ১৪৪০
মৃত্যুপুরী সিরিয়ার কঠিন বাস্তবতায় কিছুক্ষণ
মো. রাফসান আহমেদ
চোখ মেলে নিজেকে আবিষ্কার করলাম কোনো এক ধ্বংসপ্রায় শহরে। ধুলোবালিতে নিজেকেই চিনতে পারছি না। শরীরে প্রচ- ব্যথা অনুভব করছি কিন্তু ব্যথার কারণ কি জানি না। অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়ালাম। কিন্তু এ কি দেখছি আমি! যতদূর চোখ যায় শুধু ভগ্নস্তূপ। দু-একটি আধভাঙা দালানও আছে। আমি কোথায়?

আমি জানি না। আমার পরিবার, বন্ধুরা সবাই কোথায়? খুব ভয় হতে লাগল। কোনো মানুষজনও দেখতে পাচ্ছি না। না ঐ তো কিছুটা দূরে কেউ একজন শুয়ে আছে। একজন না অনেকজন। কাছে গিয়ে দেখলাম তা প্রায় জন বিশেক হবে। এর মধ্য ১৩-১৪ জনই শিশু-কিশোর। একটু পরেই বুঝতে পারলাম যারা শুয়ে আছে তারা সবাই এ পৃথিবী থেকে নিঃশ্বাস নেয়ার নিয়মটি ভঙ্গ করে এখন লাশে পরিণত হয়েছে। এই মানুষগুলোর চেহারা মধ্যপ্রাচ্যের লোকদের মতো। আমি কোথায় তাহলে? এখানে তো লাশ আর ভগ্নস্তূপ ছাড়া কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।

আধপোড়া একটি পতাকা দেখতে পেলাম। এটা তো সিরিয়ার পতাকা। তাহলে কি আমি সিরিয়ায়? কিন্তু কিভাবে? শরীরে প্রচ- ব্যথা তার সাথে এসব কি দেখছি! অনেক ভয় হতে লাগল। কিছুক্ষণ পর দূরে একটি মসজিদের মতো একটি আধভাঙা দালান দেখতে পেলাম। লাশগুলোর পাশ কাটিয়ে ওদিকে গেলাম। হা মসজিদই এটা। ভিতরে কিছু শিশু-কিশোর আর কয়েকজন বয়স্কলোক কান্না করছে। আমি ওনাদের কখনো দেখিনি। কারা এরা? চেহারা মধ্যপ্রাচ্যের লোকদের মতোই। জিজ্ঞেস করলাম কাঁদছেন কেন আপনারা? তারা কাঁদছে আর আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি আবার একই কথা জিজ্ঞেস করলাম। একজন বয়স্ক লোক আরবিতে কিছু একটা বলল। কিন্তু একি! আমি তো এদের কথা বুঝতে পারছি। এরা বলছে বাশার সরকার এবং তার মিত্র দেশসমূহ আমাদের সব শেষ করে দিয়েছে। বাচ্চাগুলো কাঁদছে আর বলছে আমার আব্বু আম্মুকে এনে দাও। একজন বৃদ্ধ লোক বলছে আমি নামাজ পরব কিন্তু ওজু করব কিভাবে? পানি নেই। তায়াম্মুম করব কিন্তু সব জায়গায় আমার সন্তান আর নাতি-নাতনিদের রক্ত। আমি কেন বেঁচে আছি? তুমি আমাকেও মেরে ফেল।

এরা যদিও আরবিতে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল কথাগুলো কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে আমার মনে হচ্ছে বাংলায় বলছে। কারণ আমি যেসব বুঝতে পারছি। এতক্ষণে বুঝতে পারলাম আমি সিরিয়ার কোনো একটি শহরেই আছি। কিন্তু কিভাবে এখানে এসেছি এখনও তা আমার নিজের কাছেই রহস্য। সিরিয়ান লোকগুলো এবং বাচ্চাগুলো আমাকে প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। কিন্তু আমি ঐ লোক ও বাচ্চাগুলোর প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারছি না। কারণ কোনো উত্তর আমার জানা নেই। যেখানে জাতিসংঘসহ সারা বিশ্ব এই মানুষগুলোর এই অবস্থা দেখেও না দেখার ভান করছে সেখানে আমি কি উত্তর দিব। চুপ করে রইলাম। আমার চোখ দিয়েও পানি পরছে। ওখানে যারা আশ্রয় নিয়েছে তাদের মধ্যে ২টি বাচ্চার মরমর অবস্থা। কোনোভাবে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। আমি কোলে নেয়ার অনুমতি নিলাম ওনাদের থেকে। কিন্তু কোলে নেয়ার আগেই সৃষ্টিকর্তা একটি বাচ্চাকে তার কাছে নিয়ে নিলেন। পাশের বাচ্চাটিকে কোলে নিলাম। বয়স কত হবে ২-৩ বছর? কোলে নিতে হাত দিয়ে আমার চশমাটা ধরতে চাইল। আমি একটি চুমো দিলাম ওর কপালে। আমার হাত ও ঠোঁট বাচ্চাটির রক্তে ভিজে একাকার। ও বেশি সময় নিল না। চিরঘুমে চলে গেল। রক্ত, মৃত্যুু এগুলো আমি বরাবরই সহ্য করতে পারি না। কিন্তু আজ আমার কি হলো! পাথর হয়ে গেছে মনটা। এদেরও মনে হয় এমনই। তাইতো এখনো এরা বেঁচে আছে। মৃত্যু, রক্ত এদের কাছে এখন পুতুল খেলা। তাই মানুষগুলোর অনুভূতি হয়তো পাথর হয়ে গেছে।

হঠাৎ দূরে কিছু একটা ভয়ঙ্কর শব্দ শুনতে পেলাম। বৃদ্ধ লোকটি বলতে লাগল আবার আসছে ওরা। এবার আমাদের সময় হয়েছে। হাসিকান্না মিশ্রিত কথা। কষ্টে নাকি খুশিতে বুঝলাম না। কিসের সময়ের কথা বলল? কিছুক্ষণ পর দেখতে পেলাম একটি যুদ্ধ বিমান আগুন ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে আসছে। যেসব আধভাঙা বাড়ি অবশিষ্ট ছিল সেগুলোকেও মাটির সাথে মিশিয়ে দিচ্ছে। এখন বুঝতে পারলাম এই লোকগুলোর কথা। মানে এখন আমাদের সবার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এসেছে। আমার ভয় হতে লাগল। বাচ্চাগুলো, কিশোরগুলো চিৎকার করছে আর বলছে, 'আমরা বাঁচতে চাই। আমাদের অধিকার নিয়ে বাঁচতে চাই। আমাদের দেশে আমরা আমাদের মতো বাঁচতে চাই। আমাদের মৃত্যুর সময় হয়নি।' বাচ্চাগুলো চিৎকারের সাথে এসব কথা বলে আহাজারি করতে লাগল।

বিমানটি ক্রমশ সামনে এগিয়ে আসতে লাগল।

বুঝলাম এদের সবার সাথে আমার জীবনও শেষ। হঠাৎ একটি বোমা পরল আমাদের সামনে আমি চোখ বুঝে চিৎকার দিয়ে উঠলাম। আর নিজেকে নিজের বিছানায় আবিষ্কার করলাম। সময় রাত ৩.১৫। মনে হয় স্বপ্ন দেখেছি। গত সন্ধ্যায় সিরিয়া নিয়ে একটু বেশিই ঘাঁটাঘাঁটি করেছি।

জানি না স্বপ্নে নাকি বাস্তবে ছিলাম। কিন্তু ওখানের বাস্তবতা এমনই। ওখানের শিশুরা বাঁচতে চায়। নিজেদের পরিবারের মৃত্যু দেখতে চায় না। ওরা চায় ওদের দেশে ওরা শান্তিতে বাস করতে। আমরা পৃথিবীর ১৯৫+রাষ্ট্র কি পারি না ওদের অধিকারটুকু নিশ্চিত করতে? নাকি মুষ্টিমেয় কিছু রাষ্ট্রের কাছে হেরে যাবে মানবতা? আমরা জাতিসংঘ তৈরি করেছি। ইউনিসেফ তৈরি করেছি। কিন্তু এরা তো এই শিশুদের নিরাপত্তা দানে ব্যর্থ। তেলা মাথায় তেল না দিয়ে এদের জন্য কিছু করা উচিত?

সকালে ঘুম থেকে উঠে দিনটি শুরু করলাম। কিন্তু সারাটা দিনই আমার কানে বাজতে লাগল সিরিয়ান বাচ্চাগুলোর সেই আর্তনাদ, 'আমরা বাঁচতে চাই, আমরা আমাদের অধিকার চাই'

জানি না এই আর্তনাদ কখনো দূর হবে কিনা!

সিরিয়াসহ পৃথিবীর কোনো দেশের মানুষের এমন একটি মৃত্যুও আর আমরা দেখতে চাই না। এদের বাঁচতে দিন। সৃষ্টিকর্তা এই মানুষগুলোর সহায় হোক।

মো. রাফসান আহমেদ : লেখক

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
আজকের নামাজের সময়সূচীনভেম্বর - ১১
ফজর৫:১০
যোহর১১:৫২
আসর৩:৩৭
মাগরিব৫:১৬
এশা৬:৩৩
সূর্যোদয় - ৬:৩০সূর্যাস্ত - ০৫:১১
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
৩৪৫১.০
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদক : আহ্সান উল্লাহ্। উপদেষ্টা সম্পাদক : মোঃ শাহাবুদ্দিন শিকদার। প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ৯৩৫৭৭৩০ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ djanata@dhaka.net
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.