নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, বৃহস্পতিবার ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২৯ ভাদ্র ১৪২৫, ২ মহররম ১৪৪০
ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে
চিত্ত ফ্রান্সিস রিবেরূ
শামীমের বয়স ১১ বছর। মিরপুর থেকে মোহম্মদপুর রুটের একটি লেগুনার হেলপারি করে সে। অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে লেগুনার পেছনের পাটাতনের ওপর এক পায়ে দাঁড়িয়ে শামীমকে যাত্রীর কাছ থেকে ভাড়া তুলতে হয় দিনের বেশিরভাগ সময়। সারাদিন বাদুরঝোলা হয়ে তার আয় হয় দুইশ টাকা। শামীম তার মা ও ছোট দুই ভাইসহ ৪ জনের পরিবার। তার বাবা ৩ বছর আগে আরেকটি বিয়ে করে অন্যত্র চলে গেছে। তাদের কোনো খোঁজ রাখে না। শামীমের মা অন্যের বাসায় বুয়ার কাজ করে, তা দিয়ে ৪ জনের পরিবারের খরচ মেটে না। তাই পরিবারের খরচ মেটাতেই ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এ কাজ করছে ১১ বছরের শিশু শামীম।

শুধু শামীম নয়, তার মতো বহু শিশু আমাদের দেশে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে। বিবিএস-এর হিসেব মতে, বাংলাদেশে মোট শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ৩৪ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত। আর সারাবিশ্বে ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা ৭ কোটি ৩০ লাখের বেশি। বিশ্বজুড়ে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম কমাতে কাজ চলছে। তবে এ গতি অত্যন্ত ধীর। এ অবস্থায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গত ১২ জুন পালিত হলো আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল 'প্রজন্মের জন্য নিরাপত্তা ও সুস্বাস্থ্য'।

জাতীয় শিশু নীতি অনুসারে ৫ থেকে ১৮ বছরের কোনো শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে পারবে না। ৫ থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত কোনো শিশুকে শ্রমে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। অথচ আমাদের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় কোমলমতি শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন কাজে জড়িত রয়েছে। সমাজের বিভিন্ন স্তরে শিশুরা তাদের শ্রম বিক্রি করেও প্রকৃত ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দেশের বেশিরভাগ গরিব পরিবারের শিশুরা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত থাকে। অভাব অনটনের কারণে অল্প বয়স থেকেই তারা এসব কাজে নিয়োজিত হতে বাধ্য হয়। শহর, নগর ও বস্তিতে বসবাসকারী শিশু লঞ্চ বা বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, রিকশা গ্যারেজ, বিভিন্ন হোটেল-রেস্টুরেন্ট, বাসাবাড়ির গৃহকর্মী, নির্মাণাধীন ভবন ইত্যাদি জায়গায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করে থাকে। অন্যদিকে গ্রামের শিশুরা তাদের অভিভাবকদের সাথে কৃষিকাজে জড়িত রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০০৩ সালের জরিপ মতে, দেশে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে নিয়োজিত ছিল ১২ লাখ ৯১ হাজার। আর সর্বশেষ ২০১৩ সালের জরিপে এ সংখ্যা ১২ লাখ ৮৩ হাজারে। এ হিসাবে এক দশকে দেশে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম কমেছে মাত্র ১০ হাজার, যা শিশুশ্রম নিরসনের আন্তর্জাতিক লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম। বিবিএস এর হিসেবে মতে, দেশের ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সি মোট ৩ কোটি ৯৬ লাখ শিশুর মধ্যে ৩৪ লাখ শ্রমে নিয়োজিত, যা মোট শিশুর প্রায় ৯ শতাংশ। শিশু শ্রমিকের মধ্যে কৃষিতে ৩৬ দশমিক ৯ শতাংশ, উৎপাদনমুখী শিল্পে ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ, বনবিভাগ ও মৎস্য খাতে ২৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং ১৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ শিশু কাজ করছে সেবা ও পণ্য বিক্রিতে।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী, ২০২১ সালের মধ্যে বিশ্ব থেকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন করতে হবে। আর ২০২৫ সালের মধ্যে কোনো শিশু শ্রমিকই থাকবে না। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ২০১৬ সালেই শিশুশ্রম নির্মূল করার লক্ষ্যে নির্ধারণ করেছিল। তবে সে সময় এরই মধ্যে অতিবাহিত হয়েছে। এখন এসডিজির লক্ষ্য পূরণ করতে হলেও ৩ বছরের মধ্যে প্রায় ১৩ লাখ শিশুকে পুনর্বাসন করতে হবে। আর ২০২৫ সালের মধ্যেই ৩৪ লাখ শিশুকে শ্রমের আওতার বাইরে আনতে হবে। আশার কথা ইতোমধ্যে পোশাক শিল্প শিশুশ্রম মুক্ত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত দরিদ্র এসব শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে বাধ্য হয়। শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে অল্প বয়সী এসব শিশুরা অমানুষিক পরিশ্রম করছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য বিভিন্ন উন্নয়নমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। তাই শিশু শ্রমিকের সংখ্যা উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়ে গেছে। আবার শিশুশ্রম বন্ধে কঠোর আইন থাকলেও তার প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন পুরোপুরি না হওয়ায় এর অন্যতম কারণ। যেহেতু বাংলাদেশ বিভিন্ন কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছ, তাই ভবিষ্যতে শিশুশ্রম নিরসনে এসডিজি লক্ষ্য পূরণের পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। শিশুশ্রমের প্রধান কারণ দারিদ্র্য এবং অসচেতনতা। তাই দারিদ্র্য দূর করতে হবে এবং অভিভাবকদেরও সচেতনতা বাড়াতে হবে।

বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে বই, উপবৃত্তি এবং দুপুরের খাবার দেয়া হচ্ছে। তাই অভিভাবকদের উচিত তাদের সন্তানকে শিশুশ্রমে না দিয়ে স্কুলে পাঠানো। অল্প বয়সে শিশুদের দিয়ে উপার্জন করার চিন্তা ভাবনা বাবা-মায়েদের বাদ দিতে হবে। পাশাপাশি দারিদ্র্য দূর করতে না পারলে শিশুশ্রম বন্ধ করা যাবে না। অতীতে নানা পদক্ষেপের কারণে পোশাক শিল্পসহ বেশ কয়েকটি প্রাতিষ্ঠানিক খাতে শিশুশ্রম শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতগুলোয় এখনও শিশুশ্রম রয়েই গেছে। বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে দরিদ্র্য পরিবারের আয় বাড়িয়ে তাদের অবস্থার পরিবর্তনের মাধ্যমে শিশুশ্রম নিরসনের ব্যবস্থা করা যায়।

বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং সরকার শিশুশ্রম নিরসনে কাজ করছে। এ লক্ষ্যে ৩ দফায় কার্যক্রম পরিচালনা করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে ২০০১ সালে বাংলাদেশে শিশুশ্রম নিরসন (প্রথম পর্যায়) প্রকল্পের ১০ হাজার, দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩০ হাজার এবং তৃতীয় পর্যায়ে ৫০ হাজার শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম থেকে বের করে আনার লক্ষ্য ছিল। ৩ বারে ৯০ হাজার শিশু পুনর্বাসনের কথা থাকলেও ঠিক কতটুকু কাজ হয়েছে এবং কত শিশু এ থেকে সুফল পেয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান জানা যায়নি। পুনর্বাসিত শিশুর হিসাব রাখা, প্রয়োজনীয় ডাটাবেজ তৈরি করা এবং এসব শিশুর সর্বশেষ অবস্থা জানা ইত্যাদি বিষয়ে নজরদারি অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। এ অবস্থায় চতুর্থ পর্যায়ে ২০২১ সালের মধ্যে ১ লাখ শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে বের করে আনার জন্য প্রকল্প নেয়া হয়েছে।

শিশুশ্রমের মূল কারণ দারিদ্র্য। দারিদ্র্য কমানো না গেলে সমাজ থেকে শিশুশ্রম নির্মূল করা সহজ নয়। সীমিত সাধ্যের মধ্যেও সরকার আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে চলেছে। শিশু শ্রমিকের সংখ্যা কমিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ সরকার গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় উন্নয়ন প্রকল্প ও পরিকল্পনা যেমন, জাতীয় বাজেট, শিক্ষা সংক্রান্ত জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় শিশুশ্রমের বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে।

সমাজ থেকে শিশুশ্রম বন্ধ করতে হলে আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি সকল নাগরিককে মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। শিশুদের অধিকার বিষয়ে সমাজের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সচেতনতা বাড়াতে হবে। আমরা যদি সকল শিশুদের বেড়ে ওঠার সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত না করতে পারি তবে সুস্থ সুন্দর সমাজ গঠন কখনোই সম্ভব নয়। এজন্য সরকারের পাশাপাশি সর্বস্তরে শিশুশ্রম বন্ধের বিষয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

পিআইডি ফিচার

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
আজকের নামাজের সময়সূচীসেপ্টেম্বর - ১৯
ফজর৪:৩০
যোহর১১:৫৩
আসর৪:১৭
মাগরিব৬:০২
এশা৭:১৫
সূর্যোদয় - ৫:৪৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৭
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
২৪১৯.০
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদক : আহ্সান উল্লাহ্। উপদেষ্টা সম্পাদক : মোঃ শাহাবুদ্দিন শিকদার। প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ৯৩৫৭৭৩০ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ djanata@dhaka.net
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.