নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, বুধবার ৩০ আগস্ট ২০১৭, ১৫ ভাদ্র ১৪২৪, ৭ জিলহজ ১৪৩৮
খুলনার গণমানুষের নির্ভীক সৈনিক শামসুর রহমান
অ্যাডভোকেট এম.মাফতুন আহম্মেদ
উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ভয় নাই ওরে ভয় নাই

নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।

যুগের আবর্তে পৃথিবীর বুকে কিছু মানুষের আগমন ঘটে। তারা ইতিহাস হয়ে জন্ম গ্রহণ করেন না। কর্মের মাধ্যমে তৈরি করেন সৃষ্টিশীল এক ইতিহাস। যুগে যুগে এসব মানুষ গুলো কর্মের মাধ্যমে অমর হয়ে আছেন। এসব যুগ শ্রেষ্ঠ মানুষগুলো হয়ে উঠেন নিলর্োভ, নিমর্োহ; গোটা জাতির জন্য এক উৎসর্গিত প্রাণ। ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় এক এক জনের আগমন ঘটে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে; এক কথায় ভিন্ন মত, পথ নিয়ে। কেউ আসেন স্ব-ধর্মকে রক্ষার জন্য, কেউ আসেন দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য। কেউ আসেন পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে দেশ-জাতিকে মুক্ত করতে। তবে সবার উদ্দেশ্য অভিন্ন। সবাই চিন্তা করেন মাটি আর মানুষকে নিয়ে। কারণ মানুষের থেকে বড় নেই কেউ এই পৃথিবীতে। এসব মানুষগুলো চিন্তাশীল, সৃষ্টিশীল, দেশ-জাতির প্রতি ছিলেন নানাভাবে আস্থাশীল। তারা 'আমি নয়, আমাদের নিয়ে ভাবেন'। সেভাবে মানবতার মুক্তির দূত হিসেবে এগিয়ে চলেন আগামীর প্রত্যাশায়।

এসব জাতীয় কর্মবীর শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মধ্যে একজন হলেন জনাব শামসুর রহমান। তিন রাষ্ট্রের পতাকার তলে থেকে তিনি বেড়ে উঠেছেন। ব্রিটিশ দুঃশাসন, পাকিস্তানি শোষণ, আর স্বাধীন বাংলাদেশকে অতি কাছে থেকে তিনি দেখেছেন। এই জাতি রাষ্ট্রের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহণ করেছেন। এসব ক্ষণজন্মা মানুষগুলো নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটু গভীরে যেতে হয়। ফেলে আসা ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে হয়। অবস্থার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে গভীর বিশ্লেষণে যেতে হয়। আর প্রকৃত ইতিহাস জাতিকে জানান দিতে হয়। যিনি এই দু:সাধ্য কঠিন কাজটি করতে পারেন তিনিই প্রকৃত ঐতিহাসিক;সত্যিকারের একজন দেশপ্রেমিক। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের পথিকৃত ছিলেন মাও:হাসরৎ মোহানী। তিনি ১৯৩৬ সালে লক্ষ্নৌতে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত কংগ্রেসের অধিবেশনে ভারতের জন্য পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তখন লালা রাজপত রাই তার পুরো হিন্দু ডেলিগেটদের নিয়ে সে প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। সেই থেকে ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে দেশ বিভাগপূর্বত্তোর পর্যন্ত বর্ণ হিন্দুদের নানা বিরোধিতা। অত:পর ভারত বর্ষে মুসলমানরা যে একটি জাতি হিন্দু বাবুরা কখনও তা স্বীকার করেনি। এসবের শেষ পরিণতি স্বরূপ মি:জিন্নাহ উত্থাপন করলেন দ্বি-জাতি তত্ত্ব। তবে এটা সত্য যে, ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এই তল্লাটের মানুষগুলো মি:জিন্নাহর দ্বি-জাতি তত্ত্বকে সমর্থন জানালেও অনেকে সেদিন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তার সাথে অভিন্নতা ঘোষণা করতে পারেননি। তবে তারা নেতৃত্বের বিরোধিতা করলেও মুসলমানদের নতুন আবাসভূমি পাকিস্তান সৃষ্টিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তাই তাদের ভাষায় ইসলামের ধ্বজাধারি তথাকথিত নবাব,বাদশাহদের পৃষ্টপোষকতায় সৃষ্ঠ মুসলিমলীগ নেতৃত্বকে তারা সমর্থন জানাতে পারেননি। কারণ তারা আঁচ করেছিলেন পাশ্চত্য বিলাতি শিক্ষায় শিক্ষিত তথাকথিত এই নেতৃত্ব দিয়ে উপমহাদেশের ভাগ্যাহত মুসলমানদের ভাগ্যের চাকা কখনও খুলতে পারেনা। তাই সম্ভবত অনেকে সেদিন পাকিস্তান সৃষ্টির নেতৃত্বের সিপাহ্সালারদের মেনে নিতে পারেননি। জনাব শামসুর রহমান ছিলেন সম্ভবত সেই আদর্শের অনুসারীদের মধ্যে একজন।

৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে মুসলিমলীগ সরকারের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন মূর্ত প্রতীক। ৫৮ সালে আইয়ুবি শাসনের বিরুদ্ধে তিনি তুলে ধরেছিলেন কলমের ঝংকার। ৬২ সালে তার নির্বাচনী এলাকা তৎকালীন বৃহত্তর খুলনা জেলার পাইকগাছা, কয়রা, আশাশুনি, দেবহাটা, কালীগঞ্জ ও শ্যামনগর উপজেলা হতে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের এম.এন.এ নির্বাচিত হন। উল্লেখ্য যে, এখন এসব এলাকা থেকে তিন জন সংসদ সদস্য স্বাধীন বাংলাদেশের পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করছেন। দেশ বিভাগত্তোর থেকে আমৃত্যু পর্যন্ত তিনি ছিলেন একজন খ্যাতিমান রাজনীতিক ও সাংবাদিক বটে। তিনি ছিলেন খুলনা প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। মুসলিমলীগ সরকারের দু:শাসনের বিরুদ্ধে এবং ইসলামের অমোঘ বাণী ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবার দৃঢ় প্রত্যয়ে ৫২ সালে খুলনা মহানগরী থেকে মরহুম আব্দুল ওহাব সিদ্দিকী সম্পাদিত 'সাপ্তাহিক তহহিদ' নামে একটি প্রতিবাদী পত্রিকার তিনি ছিলেন প্রকাশক। ধর্মীয় একটি রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়েতে ইসলামীর ভূতপূর্ব নায়েবে আমীর ও সেক্রেটারি জেনারেলের মত গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেও মা-মাটি-মানুষের স্বার্থে এ দেশের সকল অগণতান্ত্রিক চিন্তা চেতনার বিরুদ্ধে তিনি রুখে দাঁড়িয়েছেন। প্রতিবাদ মুখর হয়েছেন। লীগ সরকারের রোষানলে পড়েছেন। জেল-জুলুম খেটেছেন। একজন জাতীয় নেতা হয়েও তার প্রিয় মাটি খুলনায় পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশে আমৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি শরীক হয়েছেন। নেতৃত্বের অগ্রভাগে থেকেছেন। সেই মানুষটির কথা আজ আমরা প্রায় ভুলে যেতে বসেছি। অনেকের প্রশ্ন,যারা আজ ইসলামি আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত তারাও এই কর্মবীর মানুষটির কথা তেমন একটা স্মরনে রাখেন কিনা সন্দেহ।

বর্ষিয়ান রাজনীতিক,প্রতিথযশা সাংবাদিক জনাব শামসুর রহমানের বর্ণিল জীবন সম্পর্কে এই জাতি রাষ্ট্রের অনেকে কিছু জানতে চায়। প্রিয় পাঠক,চলুন ঘুরে আসি খুলনা শহরের আলতাপুল লেনে। যেখানে শামসুর রহমান সাহেব আমৃত্যু পর্যন্ত ৫০ দশক থেকে পরিবার নিয়ে বসবাস করেছেন। জেনে নেই ইতিহাসের এই কিংবদন্তী সম্পর্কে একরাশ দুর্লভ তথ্য। যেসব তথ্য আগামীর জন্য একটি লব্ধ ইতিহাস। সেসব দুর্লভ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আলোচ্য নিবন্ধটি।

বর্ণিল জীবনের সৃষ্টিশীল মানুষ

আগেই বলেছি ইতিহাস হয়ে কেউ জন্ম গ্রহণ করেন না। ত্যাগ.শ্রমসাধনা ও সংগ্রামই তাকে প্রকৃত আলোর পথ দেখায়। দেশ-জাতির খেদমতে তাকে উচ্চাসনে নিয়ে যায়। আর এসবের মূলে থাকে সততা, একনিষ্ঠতা এবং চারিত্রিক দৃঢতা। জনাব শামসুর রহমানের মধ্যে একরাশ সততা ছিল। ছিল একরাশ চারিত্রিক দৃঢতা। এসব ছিল বলে সকল লোভ-লালসার উধর্ে্ব থেকে ব্যক্তি জীবনে অনেক দূরে তিনি যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই ত্যাগী রাজনীতিক,সাংবাদিক,সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব সনামধন্য পিতা,খ্যতিমান শিক্ষক কফিল উদ্দিন সরদারের ঔরসে এবং মাতা মোসা: শরিফাতুন্নেসার গর্ভে ১৯১৫ সালের ৫ মে শিবসা-কপোতাক্ষ বিধৌত অসংখ্য পীর ওলি-আউলিয়ার পূণ্য স্মৃতি বিজড়িত খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার গদাইপুর ইউনিয়নের মঠবাটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। এখানে উল্লেখ্য যে,শামসুর রহমান সাহেবের পিতা ইংরেজ আমলে একজন সফল কৃতিমান শিক্ষক ছিলেন। একথা না বললে নয়,দু'শত বছর ব্রিটিশ ভারতে হিন্দু বাবুদের দাপটে মুসলমানরা হয়ে উঠেছিল দিশাহারা। সর্বক্ষেত্রে লাঞ্চিত,অবহেলিত। মুসলমানদের ভেতরে ব্রিটিশ শাসনামলে শিক্ষা-দিক্ষা এক প্রকার ছিল না বললে চলে। তখন শামসুর রহমান সাহেবের পিতা একজন সাধারণ মুসলমান ঘরের সন্তান হয়েও শিক্ষকতাকে মহান পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। যা আজকের দিনে ভাবতে অনেকের কাছে অবাক লাগে। তার পিতার সাথে দেশ বরেণ্য অনেক ব্যক্তির সু-মধুর সম্পর্ক ছিল। শামসুর রহমান সাহেবের পিতা মরহুম কফিল উদ্দীন আহম্মদ সাহেবের নানা বাড়ী ছিল জগৎ বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার পি.সি রায়ের বাড়ীর পাশ্র্বে রাড়ুলী গ্রামে। সে কারণে স্যার রায়সহ তাদের গোটা পরিবারের সাথে তার ছিল ঘনিষ্ট সম্পর্ক। শুধু তাই নয়,জেলার গুরুত্বপূর্ণ বনেদী পরিবার বিশেষ করে গদাইপুর ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট কাজী হিজবুল্লাহ,আমাদী ইউনিয়নের শাহ পরিবার,প্রখ্যাত সাহিত্যিক কাজী ইমদাদুল হকসহ অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব,সরকারী কর্মকর্তার সঙ্গে তার ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। উল্লেখ্য যে তার প্রিয় ছাত্রের মধ্যে ছিলেন অখন্ড বাংলার প্রখ্যাত সাহিত্যিক,সাংবাদিক মরহুম আব্দুল ওহাব সিদ্দিকী। সেই সফল পিতার ঔরসজাত সন্তান হলেন প্রখ্যাত রাজনীতিক জনাব শামসুর রহমান। তিনি অপূর্ব মেধা ও মননের অধিকারী ছিলেন। ম্যাট্রিকুলেশন থেকে শুরু করে ডিগ্রী পর্যন্ত তিনি কোন ক্লাসে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হননি, বরাবরই প্রথম শ্রেণিতে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন। জনাব রহমান ১৯৩৪ সালে আরবীতে লেটারসহ প্রথম বিভাগে বৃত্তি নিয়ে বিনোদ বিহারী সাধু কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কপিলমুনি সহচরী বিদ্যামন্দির থেকে ম্যাট্রিকুলেশন,১৯৩৭ সালে বাগেরহাটের পি.সি কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে বৃত্তি নিয়ে ইন্টারমিডিয়েট ও ১৯৩৯ সালে কলিকাতা সরকারি ইসলামিয়া কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ডিগ্রী পাশ করেন। কর্মের তাগিদে বারবার কোলকাতা-খুলনা যাতায়াত করতে হয়েছে। তিনি কোলকাতার প্রসিদ্ধ ইসলামীয়া কলেজ থেকে বি,এ পাশের পর ১৯৩৯ সালে মেদেনীপুর জেলার চন্দ্রঘোনা থানার কৃষ্ণপুর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং সেখানে বয়স্কদের জন্য সাইট স্কুল চালু করেন। পরে তিনি ১৯৪১-৫০ সাল পর্যন্ত সরকারি কৃষি বিভাগে অত্যন্ত সততা ও সুনামের সাথে চাকরি করেন। কিন্তু সততাই তার জীবনের কোন কোন ক্ষেত্রে কাল। ঐ চাকরি করার সময় তিনি তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী ও সচিবের নির্দেশে অনিয়ম করতে রাজি না হওয়ায় অবশেষে বিবেকের কাছে পরাজয় স্বীকার করে চাকরি থেকে তিনি ইস্তফা দেন। অতঃপর কর্তৃপক্ষের শত অনুরোধেও তিনি আর ঐ চাকরিতে ফিরে যাননি। শামসুর রহমান সাহেবের জীবনের গতি থেমে থাকেনি। সকল বাঁধা বিপত্তির মধ্যে থেকেও জীবন সম্মুখে তিনি এগিয়ে চলেছেন। অবশেষে দেশ-জাতির ভাগ্য পরিবর্তনে ঝাপিয়ে পড়লেন। চাকরির মায়া ছেড়ে ১৯৪৯ সালে স্বাধীন সাংবাদিকতায় জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫০ সালের ৮ জুন প্রকাশ করলেন নগরীর আলতাপুল লেন থেকে সাপ্তাহিক তাওহীদ নামে একটি সংবাদপত্র। ১৯৫২ সালে তাওহীদ পত্রিকাটিকে জামায়াতের মুখপাত্র হিসেবে জনসম্মুখে প্রকাশ পায়। ঐ সময়ে সরকারের বিরুদ্ধে একটি রিপোর্ট প্রকাশ হওয়ায়,তৎকালীন সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ মাঠে নামে। গোয়েন্দা বিভাগ জানতে পারে যে,ঐ পত্রিকাটির সাথে শামসুর রহমান সংশ্লিষ্ট রয়েছেন। তখন প্রশাসন তাকে বিভিন্ন অজুহাতে হয়রানি করে। তারপরেও বেশ কিছুদিন পত্রিকাটির প্রকাশনা অব্যাহত রাখেন। সাপ্তাহিক তাওহীদ পত্রিকাটি শহরের থানার মোড়ে 'মুসলিম আর্ট প্রেস' থেকে ছাপা হতো। তার মালিক ছিলেন জনাব শামসুর রহমান। তৎকালীন সরকার প্রেসটি শেষ পর্যন্ত বন্ধ করে দেন। ১৯৫২ সালে জামায়েত ইসলামির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এ সংগঠনটির পতাকাতলে তিনি যোগদান করলেন।

রাজনীতি ও সাংবাদিকতায় পদার্পণ

মাওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদীর নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামী মি:জিন্নাহর দ্বি-জাতি তত্ত্ব্বকে সংগত কারণে সেদিন মনে-প্রাণে মেনে নিতে পারেননি;সে কথা পূর্বেই বলেছি। অতএব দেশ বিভাগত্তোর পাকিস্তানি শাসকচক্রের প্রতিটি অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলাম কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করতে থাকে। শামসুর রহমান সাহেব তখন দেশ,জাতি ও জনগণের কল্যাণের কথা চিন্তা করে ব্রিটিশ শাসনাধীন চাকরি থেকে শেষ পর্যন্ত ইস্তফা দেন। রাজনীতি ও সাংবাদিকতা পেশায় ঝুঁকে পড়েন। এ কথা সত্য যে, কেউ কখনও কাপড়ের মুঠোয় প্রকৃত আগুনকে ধরে রাখতে পারে না। প্রতিভাবান শামসুর রহমানকে সেদিন কেউ ধরে রাখতে পারেনি। শামসুর রহমান দিনে দিনে মাওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদীর বিভিন্ন ধর্মীয় পুস্তাকাদি নিয়ে ব্যাপক পড়াশুনা করতে লাগলেন। পর্যায়ক্রমে তিনি ইসলামী আন্দোলনের দিকে ঝুকে পড়লেন। প্রখ্যাত রাজনীতিক মাও:এ.কে.এম.ইউসুফ তার সম্পর্কে লিখেছেন,-শামসুর রহমান সাহেব ১৯৫২ সালে তার হাত ধরে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। উল্লেখ্য যে,মুসলমানরা সবেমাত্র স্বতন্ত্র অবাসভূমি পাকিস্তান পেয়েছে। লীগ সরকার বছর না গড়াতেই পূর্ব বাংলার মানুষের বিরুদ্ধে ফ্যাসিষ্ট আচারণে মেতে উঠলেন। অত:পর ৫২-এর ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে মুসলীমলীগ সরকারের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার মানুষ ফুঁসে উঠলেন। হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন আ'লীগ,কৃষক শ্রমিক পার্টি,গণতন্ত্রী দল ও জামায়াতসহ কয়েকটি ইসলামি দলের সমন্বয়ে গঠিত হলো যুক্তফ্রন্ট। এই ফ্রন্ট ছিল পাকিস্তানি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে আপামর জনসাধারণের একটি শক্তিশালী প্লাট ফরম। যুক্তফ্রন্ট ২১ দফা দাবি নিয়ে মাঠে নামলেন। যুক্তফ্রন্টের পক্ষে শামসুর রহমান সাহেব গোটা খুলনা অঞ্চলে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ঘাটে-মাঠে মুসলীমলীগ সরকারের বিরুদ্ধে প্রচার প্রপাগ্যান্ডা চালাতে লাগলেন। উল্লেখ্য যে,শামসুর রহমান সাহেব ছিলেন শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দী সাহেবের অত্যন্ত স্নেহাভাজন। তার নির্বাচনী এলাকা পাইকগাছা-ডুমুরিয়া থেকে ৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে তিনি মনোনীত হয়েছিলেন। আর মুসলীমলীগের শক্তিশালী প্রার্থী মনোনীত হয়েছিলেন খান,এ সবুর। খুলনায় মুসলীম লীগ থেকে বেরিয়ে এসে একটি প্রগতিশীল যুবক গ্রুপ গঠন করলেন আওয়ামী মুসলীমলীগ। তাদের মধ্যে ছিলেন এ.এইচ.দেলদার আহমদ,এ.এফ.এম আব্দুল জলিল,এড.এ.এইচ আলী হাফেজ,আবু মোহাম্মদ ফেরদাউস প্রমুখ। তারা যুক্তফ্রন্ট্রের পাইকগাছাঞ্চলে প্রার্থী মনোয়নে বিকল্প চিন্তাভাবনা করতে লাগলেন। কিন্তু শামসুর রহমান সাহেবকে প্রার্থী মনোনয়নে অনড় সোহরাওয়ার্দী সাহেব। অবশেষে এ গ্রুপটি বিশেষ করে এ.এইচ.দেলদার আহমদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে নানাভাবে বুঝিয়ে সবুর সাহেবের বড় ভাই এককালে কোলকাতার ঊর্ধ্বতন পুলিশ অফিসার ব্যারিষ্টার গণি খানকে চূড়ান্ত মনোনয়ন প্রদান করেন। শামসুর রহমান মনোনয়ন না পেলেও সেদিন কোন মনোকষ্ট পাননি। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে নৌকা প্রতীক নিয়ে ব্যারিষ্টার গণি খানের পক্ষে তিনি ব্যাপক নির্বাচনী গণ সংযোগ শুরু করলেন। এ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী একবারেই অপরিচিত গণি খান বিপুল ভোটে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের সদস্য হিসেবে বিজয় লাভ করেন। অপরদিকে হারিকেন প্রতীক নিয়ে মুসলীমলীগ প্রার্থী খান.এ সবুরের ব্যাপক পরাজয় ঘটে। এ পরাজয়ের মূলে শামসুর রহমান সাহেবের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।

৬২ সালে নতুন শাসনতন্ত্রনুযায়ী আইয়ুব খান মৌলিক গণতন্ত্রের নামে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানব্যাপী এক নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছিলেন। এ নির্বাচনে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন যে কথা পূর্বেই বলেছি। ১৯৫৫ সালে তিনি জামায়াতের রুকন হন। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৩ বছর খুলনা জেলা শাখার আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৮ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত ৪ বছর খুলনা বিভাগের সেক্রেটারী ও ১৯৮৩ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ২০ বছর জামায়াতের নায়েবে আমীর হিসেবে এবং দারুল ইসলাম ট্রাষ্টের সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জামায়াতের গঠনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য যে কমিটি হয়েছিল তার আহবায়ক ছিলেন। ইসলামী আন্দোলন করার কারণে ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত এবং ১৯৮৫ সালের এপ্রিল থেকে ১৯৮৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দ্বিতীয় বারের মত তাকে ৭ মাস জেল খাটতে হয়। সর্বশেষ তিনি ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

তিনি যখন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য সে সময়ে তিনি খুলনা সদরের সাথে বৃহত্তর পাইকগাছা অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ রক্ষার্থে কপিলমুনি হয়ে কাঠালতলা সড়ক দিয়ে খুলনা সদরের সাথে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা তার নিজের। বোয়ালিয়া কৃষি খামার স্থাপনে তার ভূমিকা অনন্য। আজকের পাইকগাছা সদরে তার গোটা পরিবারের অর্থায়নে প্রতিষ্টিত একটি আর্থ-সামাজিক প্রতিষ্ঠান 'আল-আমীন ট্র্যাষ্ট' আজও মড়েল হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

পূর্বেই বলেছি রাজনীতির পাশাপাশি তিনি শুরু করলেন সাংবাদিকতা। ৫২ সালে তিনি প্রকাশ করলেন তাওহীদ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। মুসলীম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা নিয়ে ক্ষুরধার লেখনী চালিয়ে যেতে লাগলেন। তাওহীদ পত্রিকা সম্পর্কে মন্তব্য করে এড.আব্দুল হালিম তার বইতে মন্তব্য করেছেন-'পত্রিকাটি নিয়মিত এবং খুলনা শহর ও মফস্বলের অনেক সংবাদ তাতে পরিবেশিত হতো। সাপ্তাহিক তাওহীদের মত একখানা সংবাদ সাহিত্য পত্রিকা আজও গড়ে ওঠেনি বলে অনেকের ধারণা'। এই সাপ্তাহিকটি প্রকাশ করতে যেয়ে তিনি হামলা-মামলা,জেল-জুলুমের নানা শিকার হয়েছেন। তবুও তিনি শাসক মহলের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে নির্ভয়ে কলম যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকলেন। দেখতে দেখতে চলে এলো ১৯৫৮ সাল। ১৯৫৬ সালের প্রধানমন্ত্রী চৌধুরি মোহাম্মদ আলীর আমলে রচিত প্রথম ও পূর্ণাঙ্গ শাসনতন্ত্রটি বাতিল করে ১৯৫৮ সালে ৮ অক্টোবর আইয়ুব খান বাক স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারকে ক্ষুন্ন করে সবর্োপরি সকল রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করে জারী করলেন 'মার্শাল ল'। আইয়ুবের এই সামরিক শাসন ছিল খুবই ঝাঁঝাল ও কড়া। তাই সব রকমের রাজনৈতিক ক্রিয়া কর্মের উপরে ছিল কঠোর নিষেধাজ্ঞা। সকল রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিষিদ্ধ থাকায় জনাব শামসুর রহমান সাহেব সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার দিকে মনোযোগ দিলেন। তার প্রকাশিত পত্রিকার মাধ্যমে 'মার্শাল ল' সরকারের বিরুদ্ধে কর্মকান্ড চালিয়ে যেতে লাগলেন। শুরু হলো শাসক মহলের গাত্রদাহ। তারা তাদের পেটুয়া বাহিনী দিয়ে তাওহীদ পত্রিকা অফিসে আগুন জ্বালিয়ে দিলেন। তখন কোন উপায়ন্তর না পেয়ে তিনি ইংরেজি পত্রিকা দৈনিক অবজারভারের খুলনা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করলেন। একই সাথে একটি নামকরা সংবাদ সংস্থা এ.পি.পির আঞ্চলিক প্রতিনিধিরও দায়িত্বে পালন করতে থাকেন। শামসুর রহমান সাহেব তখন রাজনীতি ও সাংবাদিকতা অঙ্গনে অত্যন্ত পরিচিত একটি নাম। ১৯৫৯ সালে খুলনা প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠায় শামসুর রহমান সাহেবের ভূমিকা ছিল অনন্য। অস্বীকারের কোন উপায় নেই,খুলনার সাংবাদিকতা ও প্রেসক্লাবের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাথে শামসুর রহমানের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে এবং থাকবে। আগেই বলেছি তিনি ছিলেন খুলনা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। আজকের এই প্রজন্মে যারা সাংবাদিকতা করছেন এ ইতিহাস তাদের একান্তভাবে জেনে রাখা উচিত। সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ শামসুর রহমান সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে খুলনার প্রবীণ সাংবাদিক ও খুলনা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মনিরুল হুদা বলেন,-তিনি একটি রাজনৈতিক আদর্শের বিশ্বাসী হলেও তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের মাঝে। সাংবাদিকতা পেশা ছেড়ে ফুল টাইম রাজনীতিবিদ হয়েও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সাংবাদিকদের সাথে ছিল তার গভীর সম্পর্ক। যে কারণে খুলনার সাংবাদিক সমাজ তাকে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। তিনি প্রাচীনতম জাতীয় দৈনিক সংগ্রামের দীর্ঘদিন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি যে কত নির্ভীক ছিলেন ২০০৩ সালে খুলনা প্রেসক্লাবে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জনাব শামসুর রহমান তার জীবনের স্মৃতিচারণমূলক এমন একটি ঘটনা প্রকাশ করে বলেন,-সাংবাদিকতায় রাষ্ট্রীয় প্রতিবন্ধকতা যুগে যুগে ছিল,এখনও আছে এবং থাকবে,তারপরেও কলম যোদ্ধারা সকল প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে এগিয়ে যাবে।

অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী

শামসুর রহমান সাহেব শৈশব থেকে স্ব-ধর্মের প্রতি ছিলেন ধর্মাত্না। তবে অন্য ধর্মের প্রতি তিনি কখনও ছিলেন না বৈরি । বরং তাদের অধিকার আদায়ে তিনি ছিলেন সব সময় সচেষ্ট। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী এই ব্যক্তিত্ব সম্ভবত ইসলামের সু-মহান দর্শন ছড়িয়ে দেবার প্রত্যয়ে সেদিন তিনি জামায়াতে ইসলামীর ছায়াতলে আবদ্ধ হয়েছিলেন। এই মত,এই পথকে তিনি রাজনীতির রঙ্গালয়ে শেষ পর্যন্ত বেছে নিয়েছিলেন। যদিও জামায়াতের ইসলামী ভাষায় আদর্শিক চেতনার নানা কারণে তারা মহান মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা করেছিল। এক পর্যায়ে তারা খুন-ধর্ষণ-অপহরণ,লুটতরাজ করেছে। সময়ের পেক্ষাপটে তাদের অনেকের বিচার হয়েছে। তবে শামসুর রহমান সাহেব ছিলেন এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। দেশে-দেশে হত্যা, ধর্ষণের কোন অভিযোগ তার বিরুদ্ধে কেউ অদ্যাবধি দিতে পারেনি। অথচ তিনি ছিলেন জামায়াতের শীর্ষ স্থানীয় একজন নেতা। রাজনীতিতে পরস্পর ভিন্নমত থাকতে পারে। তবে একজন সাদা মনের মানুষের প্রতি সবার শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত। বছর নয় আগের কথা। একবার তার নিজের এলাকায় এক মুক্তিযোদ্ধা পাইকগাছা-কয়রার খ্যাত-অখ্যাতদের নিয়ে 'স্মরণীয়-বরণীয়' নামে ক্ষুদ্রাকার একটি বই প্রকাশ করেন। সেখানে শামসুর রহমান সাহেব বা খ্যাতিমান অনেকের কোন নাম ছিল না। এসব কৃতিমানদের নাম না থাকায় এই বইয়ের গ্রন্থকার লেখককে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন,-'তিনি রাজাকার ছিলেন'। উল্লেখ্য যে আগেই বলেছি,শামসুর রহমান সাহেব তখন খুলনা বিভাগের জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ স্থানীয় একজন ব্যক্তি। ওই মুক্তিযোদ্ধা লেখকের পিতা ছিলেন ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক। তিনি '৭১ সালে রাজাকার বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে খুন হন। হয়তবা শামসুর রহমান সাহেবের নাম বইটিতে লেখক কোন মতলবী উদ্দেশ্য সাধনের অভিপ্রায়ে দিতে পারেননি;বা কোন কারনে কৃপণতার আশ্রয় নিয়েছিলেন। তবে সত্য কোনদিন গোপন থাকে না। একদিন না একদিন বেরিয়ে পড়বেই পড়বে। লেখক তার পিতার হত্যাকারীদের স্মৃতিচারণ করতে যেয়ে শামসুর রহমান সম্পর্কে বইয়ের একটি কোনায় ইতিবাচক মন্তব্য করেন। যা প্রশংসনীয় বটে। শামসুর রহমান যে মানবিয় গুণাবলী সম্পন্ন একান্ত সাদাসিধা লোক ছিলেন,অন্যের মত ওই লেখকের বুঝতে শেষমেষ কোন অসুবিধা হয়নি। লেখক তার বইতে যা লিখেছিলেন তা সুহৃদয় পাঠকের স্বার্থে হুবহু তুলে ধরা হলো। ্ত-রাজাকাররা তার বাড়ী গিয়ে তাকে(মনি মিয়াকে) ধরে ফেলে। বাতিখালী ও সরলের দুই বাড়ীতেই তারা লুটপাট চালায় এবং বন্দুক দু'টো নিয়ে নেয়। ঐ রাতে রাজাকাররা জেলাবোর্ডের ওভারশীয়ার শাহ সৈয়দ আলী সাহেবের দ্বিতীয় পুত্র শাহ মিজানুর রহমান,ঘোষালের গাজী সামসুর রহমান,মঠবাটির মনোহর ও বোয়ালিয়ার মালোপাড়ার বিনোদকে ধরে নিয়ে যায়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে সমস্ত ইউনিয়নের সাধারণ মানুষ ভোরে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। অনেকে স্বত:স্ফূর্তভাবে জামায়াত নেতা শামসুর রহমান সাহেবকে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে তাকে বাঁচানোর অনুরোধ করলে তিনি একটা মেজেস পাঠান রাজাকার কমান্ডারের নিকট তাকে না মারার জন্য। পাইকগাছা জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন মেসেজটি নিয়ে রওনা হলেও তিনি গদাইপুর হাটে এক দোকানে বিশ্রাম নেয়ার কথা বলে অপেক্ষা করেন। ধৃতদের কপিলমুনি ক্যাম্প পর্যন্ত নিতে গেলে সাধারণ মানুষ তাদেরকে ছিনিয়ে নিতে পারে এই আশঙ্কায় রাজাকাররা শিলেমানপুর গ্রামের পাশে কপোতাক্ষ নদীতে নিয়ে তাদেরকে সকাল ৮টার দিকে গুলি করে হত্যা কর্তে-। শামসুর রহমান সেদিন একজন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠককে বাঁচানোর আকুতি জানিয়ে ছিলেন। উদ্বেগের সাথে এ ব্যাপারে স্থানীয় রাজাকার কমান্ডারের কাছে চিঠি লিখেছিলেন। ভাবতে অনেকের কাছে একটু হলেও কী বিস্ময় লাগে না?

প্রিয় পাঠক,এখন তাকে কি বলেন? কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? বড় রাজাকার হিসেবে? না নিন্দিত না নন্দিত হিসেবে? না তিনি প্রকৃত গণমানুষের নেতা ছিলেন? হয়ত স্মরণীয়-বরণীয় ছোট ওই বইটিতে তার নাম নেই। বইটির খ্যাতিমান লেখক নিশ্চয়ই জানেন,কাউকে বড় করতে যেয়ে কাউকে ছোট করতে নেই। যারা প্রকৃত খ্যাতিমানরা তারা এসব করেন না। আমরা জানি লেখক অনেক বড় মাপের একজন মানুষ। তিনি শামসুর রহমান সাহেবকে যথার্থই মূল্যায়নে কৃপণতা দেখিয়েছেন। তাতে মি:রহমানের কী কোন ক্ষতি হয়েছে? হয়নি। কারণ একজন লেখকের দায়িত্ব হচ্ছে ঘটনার সঠিক সত্যতা তুলে ধরা। সেক্ষেত্রে তিনি তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। নানা কারণে অপরাগতা প্রকাশ করেছেন। লেখক সংকীর্ণতার উধর্ে্ব উঠে ঘটনার সঠিক সত্যতা তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন। ইচ্ছাকৃতভাবে অপরকে সম্মান জানাতে কুন্ঠাবোধ করেছেন। কিন্তু লেখক অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার পিতাকে বাঁচানোর তাগিদে শামসুর রহমানকে বইয়ের একটি ক্ষুদ্র অংশে কিছু একটা না লিখলে নয় তাই লিখেছেন। হয়তবা অনেকে বলবেন তার নাম উল্লেখ করেছেন কিছুটা অনিচ্ছার ওপর। হতেও পারে। কারণ এদেশে কে কার মূল্যায়ন করে। স্বাধীন দেশ। সবাই আমরা সমান। তবে সময়ে সব কিছু একদিন ঠিক হয়ে যাবে। কারণ সময় হলো একজন বিচারক। সময়ের প্রেক্ষাপটে বিচারক সব কিছু মূল্যায়ন করেন। বিচারিক ভূমিকা পালনে কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সবাইকে মনে রাখতে হবে এদিন সেদিন নয়,সামনে আছে আরও বহুদিন।

তিনি অমর হয়ে আছেন

আগেই বলেছি তিনি ছিলেন নির্ভীক,সাহসী,প্রজ্ঞাবান,সুশিক্ষিত ও ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন একজন সাদাসিধা মানুষ। তিনি ছিলেন সর্বক্ষেত্রে সত্যবাদী ও ষ্পষ্টভাষী একজন অতি সাধারণ মানুষ। এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এই জাতি রাষ্ট্রে একজন অসাধারণ ব্যক্তি। কোন অন্যায়কে তিনি কখনও প্রশ্রয় দেননি। এই সত্যানুরাগী মানুষটি ২০০৮ সালের ২রা নভেম্বর ভোর ৬.৪০ মিনিটে ৯৩ বছর বয়সে এই নশ্বর দুনিয়া ছেড়ে পরকালের অসীম জগতে পা বাড়ান। তিনি আজ না ফেরার দেশে। নীরবে ঘুমিয়ে আছেন তার স্মৃতি বিজড়িত পূণ্যভূমি পাইকগাছা উপজেলার মঠবাটি গ্রামে;পারিবারিক গোরস্থানে। ঐদিন সকাল ১১ ঘটিকায় স্থানীয় গদাইপুর ফুটবল ময়দানে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে তার নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন স্বচক্ষে দেখেছিলাম গদাইপুর ফুটবল ময়দানে হাজার হাজার জনতার উপস্থিতিতে হৃদয়স্পর্শী নানা বিয়োগান্ত ঘটনা। দেখেছিলাম শোকাহত মানুষের প্রিয় নেতার প্রতি শেষবারের গভীর শ্রদ্ধা জানাতে। সন্দেহ নেই,মৃত্যুর পরে মনে হয়েছে জনাব শামসুর রহমান সর্ব সাধারণের কাছে একজন জনদরদি নেতা ছিলেন। এই মানুষটি আর ফিরে আসবেন না আমাদের মাঝে। তবুও তিনি অমর হয়ে আছেন, কোটি মানুষের হৃদয়ে।

অ্যাডভোকেট এম.মাফতুন আহম্মেদ : কলামিষ্ট

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
আজকের নামাজের সময়সূচীঅক্টোবর - ১৬
ফজর৪:৪১
যোহর১১:৪৫
আসর৩:৫৪
মাগরিব৫:৩৫
এশা৬:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:৫৭সূর্যাস্ত - ০৫:৩০
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
৪৩৪১.০
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদক : আহ্সান উল্লাহ্। উপদেষ্টা সম্পাদক : মোঃ শাহাবুদ্দিন শিকদার। প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ৯৩৫৭৭৩০ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ djanata@dhaka.net
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.