নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, সোমবার ১০ আগস্ট ২০১৫, ২৬ শ্রাবণ ১৪২২, ২৪ শাওয়াল ১৪৩৬
মানবপাচার বন্ধ না হওয়ার নেপথ্যে
ডক্টর শেখ সালাহ্উদ্দিন আহ্মেদ
২০১৪ সালের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত গত ছয় মাসে অবৈধপথে পাড়ি জমাতে যেয়ে অন্তত ৬২০ জন অভিবাসী মারা যায় এবং এদের মধ্যে কেউ থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে সাগরে ডুবে এবং বাকিরা সেখানে যাওয়ার পর নানা অত্যাচার নির্যাতনে মারা যায়। গত ৮ মে শুক্রবার জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এদের মধ্যে অনেকে আবার খাবারের অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া পৌঁছুতে পেরেছে এমন অনেকের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থাটির কর্মীদের। অভিবাসীরা সংস্থার কর্মীদের জানিয়েছেন, সাগরে নৌযান ডুবেও অনেকে মারা গেছেন। তাই সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না কতোজনের প্রাণহাণী হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন আশ্বাস দিয়ে অবৈধপথে অসহায় বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। অনেকসময় সাগরপথেই কোস্টগার্ডের হাতে ধরা পড়ে যায় তারা। আবার অনেকে পালিয়ে যেতে পারলেও তাদেরকে থাইল্যান্ড অথবা মালয়েশিয়ার বিভিন্ন গহীন জঙ্গলে রেখে দেয়া হয়। সেখানে তাদেরকে আটকে রেখে পরিবারের কাছ থেকে বিভিন্ন অংকের মুক্তিপণ দাবি করে দালালরা।

ক্যাম্পগুলোতে একসাথে ৫০০ থেকে ৮০০ জন করে লোককে গাদাগাদি করে রাখা হয়। সেখানে ঠিকমতো ঘুমানোর ও খাবারের ব্যবস্থা থাকে না। প্রতিবেদনে বলা হয়, সমুদ্রপথে এবং ক্যাম্পে অনেক সময় নারীদের নানা রকম যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়। সমুদ্রপথে চলতো নারী ধর্ষণও। ইউএনএইচসিআর এর এক কর্মকর্তা এসব ক্যাম্প থেকে বের হয়ে আসা শতাধিক লোকের সাথে আলাপ করেন।

তারা জানান, ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে খুবই কম টাকার বিনিময়ে দালালরা তাদেরকে সমুদ্রপথে নিয়ে যায়। এমনকি কোনো রকম টাকা ছাড়াও অনেককে সমুদ্র পথে নিয়ে যাওয়া হয়। দালালরা তাদেরকে বলতো, পরে চাকরি করে টাকা দিলেও চলবে। সেখানে যাওয়ার পর ঘটতো উল্টো ঘটনা, চাকরি তো দূরের কথা, উল্টো ঐসব লোকের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হতো। একবার নৌযানে উঠাতে পারলে দালালদের আচরণ পরিবর্তন হয়ে যায়। অনেক সময় মাছ ধরতে থাকা শিশুদের তারা জোর করে নৌযানে উঠিয়ে নেয়। পরে প্রত্যেকের পরিবারের কাছ থেকে মুক্তপণ চাওয়া হয়। টিকে থাকা এসব অভিবাসীদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্যাম্পে থাকা অভিবাসীদের ওপর নির্যাতন করার ঘটনা ছিল খুবই সাধারণ বিষয়। অনেক নারীকে ধর্ষণ পর্যন্ত করা হতো।

সমপ্রতি থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে শংখলা প্রদেশের গহীন জঙ্গলে একে একে গণকবরের সন্ধান পাওয়ার পর বিষয়টি আলোচিত হয়ে উঠে। মাথাচাড়া দিয়ে উঠে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। থাইল্যান্ডের সরকারও বিষয়টি নিয়ে কড়া সমালোচনার মুখে পড়েন।

এর আগে গত ২৯ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার সকালে বঙ্গোপসাগরের কুতুবদিয়া চ্যানেলে ট্রলারডুবিতে অবৈধ পথে মালয়েশিয়াগামী প্রায় অর্ধশত যাত্রীর প্রাণহানির হয়েছে। নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড এবং স্থানীয় অধিবাসীরা ৯টি লাশ ও ৪২ জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করলেও প্রায় অর্ধশত যাত্রী এখনো নিখোঁজ। শতাধিক যাত্রী নিয়ে ট্রলারটি অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথে কুতুবদিয়া চ্যানেলে দিকে ডুবে যায়।

বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় অবৈধ পথে যাওয়ার সময় প্রতিবছরই ট্রলারডুবিতে সলিলসমাধির ঘটনা ঘটছে। অবৈধ পথে যারা সাগর পাড়ি দিতে সমর্থ হচ্ছে তাদের একাংশকে থাইল্যান্ডে নিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে ক্রীতদাস হিসেবে। অন্য যে অংশ মালয়েশিয়ায় পৌঁছাচ্ছে সেখানেও তাদের প্রতিনিয়তই ভোগান্তির শিকার হতে হয়। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় তাদের পালিয়ে থাকতে হচ্ছে সে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভয়ে। মালয়েশিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নামমাত্র পারিশ্রমিকে তারা কাজ করতে বাধ্য হয়। অবৈধ অভিবাসী হওয়ায় ন্যায্য মজুরি দাবি করা যেমন সম্ভব হয় না তেমনি বিকল্প কাজের সন্ধানও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

মানব পাচার বন্ধে সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী পদক্ষেপ নেয়া হলেও তা বন্ধ হচ্ছে না সাধারণ মানুষের সচেতনতার অভাবে। পাচারকারী চক্রের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যের গাঁটছড়া থাকায় প্রায় অবাধেই চলছে এই অপরাধবৃত্তি। কুতুবদিয়া চ্যানেলে গত ২৯ জানুয়ারি ট্রলারডুবিতে যে অর্ধশতাধিক যাত্রী নিখোঁজ রয়েছে তাদের অনেকেরই যে সলিলসমাধি হয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। এ ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি রোধে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আঘাত হানা দরকার। এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি জনসচেতনতা সৃষ্টিতে সামাজিক সংগঠনগুলোকেও সচেতন হতে হবে। দেশের সুনামের স্বার্থেই পাচারকারী চক্রের সদস্যদের খুঁজে বের করা এবং শাস্তি বিধানে উদ্যোগী হতে হবে।

সাগরপথে ট্রলারে করে অবৈধভাবে যারা মালয়েশিয়ায় যাচ্ছেন তাদের এক বড় অংশকে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দিচ্ছে মানব পাচার চক্রের দালালরা। অন্য অংশ নিষ্কৃতি পাচ্ছে মুক্তিপণের বিনিময়ে। বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় যারা যাচ্ছেন তাদের সংখ্যা হাজারে হাজার। সাগরপথে এদের নেয়া হয় থাইল্যান্ডের গভীর জঙ্গলে। সেখানে তাদের একাংশকে আটকে রেখে আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হয়। মুক্তিপণ পেলে তাদের মালয়েশিয়ায় গোপন পথে পাঠিয়ে দেয়া হয়। যারা মুক্তিপণ দিতে ব্যর্থ হয় তাদের থাইল্যান্ডের ব্যবসায়ীদের কাছে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয়। এসব ক্রীতদাসকে অর্ধাহারে-অনাহারে রেখে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে বাধ্য করা হয়।

মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে প্রায়ই ডাকাতদের আক্রমণের শিকার হয় মানব পাচারিদের ট্রলার। ডাকাতরা ট্রলারের লোকজনকে বন্দি করে থাই মৎস্য খামারিদের কাছে বিক্রি করে দেয়। সম্প্রতি বিবিসি, মার্কিন ম্যাগাজিন টাইম ও ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ানে থাইল্যান্ডের দাস ব্যবসার যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তা স্তম্ভিত হওয়ার মতো। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়- থাই পুলিশ সে দেশের গভীর জঙ্গল থেকে দাস হিসেবে নিয়োজিত ১৭০ জনকে উদ্ধার করেছে। তাদের মধ্যে ১২২ জন বাংলাদেশি। থাইল্যান্ডের চিংড়ি ও সি-ফুড শিল্পে কর্মরত সাড়ে ছয় লাখ শ্রমিকের মধ্যে তিন লাখই ক্রীতদাস হিসেবে কাজ করছে। মূলত কম্বোডিয়া, মায়ানমার ও বাংলাদেশের নাগরিকরা পাচার চক্রের শিকারে পরিণত হয়।

মানবপাচার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এখনই সক্রিয় হতে হবে। বিশেষত অবৈধভাবে ট্রলারে করে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর নামে কী ধরনের প্রতারণা হচ্ছে সে সম্পর্কে উপকূলীয় অঞ্চলে জনসচেতনতা গড়ে তোলা দরকার। বাংলাদেশ থেকে মানবপাচার করছে একাধিক সিন্ডিকেট। স্বভাবতই পাচারকারীদের টার্গেট হচ্ছে নারী ও শিশু। বস্তুত গোটা বিশ্বেই সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া এবং সংঘাতের শিকার মানুষ হয়ে ওঠে সহজ টার্গেট। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উদ্ধৃত করে একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে গত ৪০ বছরে ১০ লাখের বেশি নারী-শিশু পাচার হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এই সংখ্যা সত্যিই বিরাট।

মনে রাখতে হবে, আইন সত্ত্বেও মানব পাচার বন্ধ না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ মাঠ পর্যায়ের নিষ্ক্রিয়তা। আর এর পেছনে কেবল অবৈধ লেনদেন নয়, স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক প্রভাবও ক্রিয়াশীল। পাচারকারীরা প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়াও পেয়ে থাকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশক্রমে মানবপাচারে সম্পৃক্ত যে তিন শতাধিক ব্যক্তির তালিকা তৈরি করেছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা, সেখানেও রয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতা। কার্যকরভাবে মানবপাচার বন্ধ করতে হলে অপরাধী যেই হোক, যে রাজনৈতিক রঙেরই হোক ছাড় দেয়ার অবকাশ নেই।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আন্তরিকতার সঙ্গে উদ্যোগী হলেই মানবপাচার অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব। কারণ এই অপকর্মের বড় অংশ সংঘটিত হয় স্থল ও নৌ সীমান্ত পথে। কারা এর সঙ্গে জড়িত তাও একেবারে অজ্ঞাত নয়। সীমান্ত অঞ্চলে কড়া নজরদারি এবং পাচারে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়া সম্ভব। একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতেও মনোযোগ দিতে হবে। প্রশাসনের পাশাপাশি এই ক্ষেত্রে তৎপর বেসরকারি উন্নয়ন ও সামাজিক সংগঠনগুলোও এগিয়ে আসতে পারে। সচেতন নাগরিকই হতে পারে মানবপাচার রোধের উত্তম প্রহরী। কিন্তু এই কাজের প্রেরণা, সহযোগিতা ও প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকেই।

ডক্টর শেখ সালাহ্উদ্দিন আহ্মেদ : লেখক


Fatal error: Uncaught exception 'PDOException' with message 'SQLSTATE[HY000]: General error: 26 file is encrypted or is not a database' in /home/janata/public_html/lib/newsHitCount.php:7 Stack trace: #0 /home/janata/public_html/lib/newsHitCount.php(7): PDO->query('Update newsHitC...') #1 /home/janata/public_html/lib/index.php(135): require('/home/janata/pu...') #2 /home/janata/public_html/web/details.php(10): lib->newsHitCount() #3 /home/janata/public_html/web/index.php(28): include('/home/janata/pu...') #4 /home/janata/public_html/index.php(15): include('/home/janata/pu...') #5 {main} thrown in /home/janata/public_html/lib/newsHitCount.php on line 7