নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, রবিবার ২০ জুলাই ২০১৪, ৫ শ্রাবণ ১৪২১, ২১ রমজান ১৪৩৫
বাংলা সাহিত্যে পদ্মা নদীর দুই কাণ্ডারী
বিক্রমজিৎ ভট্টাচার্য
যৌবনকালে রবি ঠাকুর জমিদার হিসেবে রাজস্ব সংগ্রহের কাজে গিয়েছিলেন উত্তরবঙ্গে। অভিজাত সমাজের বাইরে এই প্রথম তার গ্রাম-বাংলার সাধারণ মানুষকে দেখা। যদিও সে সময় কবিগুরুর ভাষায় 'মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লেখকেরা' সকলেই 'প্রতাপ সিংহ বা প্রতাপাদিত্যের ধ্যানে নিবিষ্ট।' রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্প সেই নিবিষ্টতা থেকে দূরে গ্রাম-বাংলার সহজ প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষের জীবনাভিসারী হয়েছিল। রতন, ফটিক, সুভা, রাইচরণ- এরা আমাদের সামনে আপন স্বকীয়তায় উপস্থিত হলো। কুষ্টিয়া, পাবনা, রাজশাহীর বিশাল ভূখ-ের রূপে যখন মুগ্ধ কবি নিরুদ্দেশের উদ্দেশে যাত্রী, তখনই নদী-পার্শ্বস্থ ঐসব এলাকার মানবজীবন তাকে আকৃষ্ট করেছে সংসারের সুখ-দুঃখ, মিলন-বিরহের মঞ্চের দিকে। কবির কাছে নদী অবিরাম গতির প্রতীক। প্রতীক ব্যাপক অর্থে। ভাঙা-গড়া তরঙ্গ জলোচ্ছ্বাসের মধ্যদিয়ে পদ্মা তার কাছে বাস্তব সত্য। এই পদ্মার সুন্দরী রূপ তিনি সযত্নে মিশিয়েছেন তার ছোট গল্পগুলোর বর্ণনায়। পাশাপাশি এসেছে যমুনা, নাগর, ইছামতীর নামও। পদ্মার বিপুল বিস্তার ও অন্তহীন রূপ বৈচিত্র্য কবিগুরুর সমস্ত অন্তঃলোক অধিকার করেছিল। আসলেই, পদ্মা পরিণত হয়েছে এক মানবীয় সত্তায়, ভরা বর্ষায় দু'কূল-প্লাবনী পদ্মার কাছে কবি পেয়েছেন জীবনের আশ্বাস, এমনকি তার ভয়ঙ্কর ভয়াল ভাঙনেও যেন মিশে আছে পিপাসার সৌন্দর্য।

'বর্ষা আসিল। ক্ষুধিত পদ্মা উদ্যান গ্রাম শস্যক্ষেত্র এক এক গ্রাসে মুখে পুরিতে লাগিল। বালুকা চরের কাশবন এবং বনঝাউ জলে ডুবিয়া গেল। পাড় ভাঙার ঝুপঝাপ শব্দ...'এই সর্বনাশী পদ্মার ডাকে খোকাবাবু যখন সাড়া দেয় তখন হতবুদ্ধি রাইচরণের অসহায়তাও তীব্রতর হয়।

'পোস্টমাস্টার' গল্পটিতে কবি কোনো নদীর নাম উচ্চারণ করেননি, কিন্তু তাঁর বর্ণনার মহিমা থেকে আঁচ করা যায় এ নদী নিশ্চয়ই পদ্মা। বর্ষাকালে তরঙ্গায়িত পদ্মা আর গল্পের সেই বেদনাকাতর বালিকার অশ্রুপাত পাঠকের মন কেবলই ভারাক্রান্ত করে তোলে।

তবে পদ্মা এবং তার শাখা নদী পথে যাতায়াতের সময় কবিগুরু যে কেবল লাবণ্য ও সম্পদ দেখেছেন, শুধু তা নয়- 'পাট পচানির গন্ধে বাতাস ভারাক্রান্ত, উলঙ্গ পেটমোটা পা সুরু রুগ্ন ছেলেমেয়েরা এখানে সেখানে জলে-কাদায় মাখামাখি ঝাঁপাঝাঁপি করতে থাকে_ ঘরে ঘরে বাতে ধরছে, পা ফুলছে, সর্দি হচ্ছে, জ্বর ধরছে... এতো অবহেলা, অস্বাস্থ্য, অসৌন্দর্য, দারিদ্র্য, মানুষের বাসস্থানে কি এক মুহূর্তও সহ্য হয়।' কবির এই অভিজ্ঞতা তাকে সৃষ্টিকর্মে প্রেরণা দেয়নি। তিনি স্পষ্টই বলেছেন, 'এ দৃশ্য কোনোমতেই ভালো লাগে না।' হতশ্রী যা কিছু দেখেছেন, তিনি তা নেপথ্যেই রাখতে ভালোবেসেছেন।

এটা বোধ হয় অস্বীকার করা যায় না যে, তার ছোটগল্পে বাইরের আচরণ ও আবেষ্টনীর চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মানব চরিত্রের বিশ্লেষণ ও সম্পর্কের টানাপোড়েন। এক পত্রে পদ্মা সম্পর্কে তিনি ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীকে লিখেছেন :

'বাস্তবিক আমি পদ্মাকে ভালোবাসি। এখন পদ্মার জল অনেক কমে গেছে। বেশ স্বচ্ছ কৃশকায়া হয়ে এসেছে, একটি পা-ুবর্ণ..... ছিপছিপে মেয়ের মতো, নরম শাড়িটি গায়ের সঙ্গে বেশ সংলগ্ন সুন্দর ভঙ্গিতে চলে যাচ্ছে, আর শাড়িটি বেশ গায়ের সঙ্গে বেঁকে বেঁকে যাচ্ছে...।'

অপরদিকে বাংলার শ্রেষ্ঠ তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের একজন মানিক। পদ্মা উদাত্ত হয়ে এসেছে তার লেখায়। কিন্তু ভাসমান নৌকা থেকে তীরভূমির পল্লীকে তিনি দর্শন করেননি। মাঝিদের সঙ্গে জীবনযাপনের দুঃসাহস দেখিয়েছেন তিনি। তাই কল্পনার চেয়ে বাস্তবতাই তার লেখায় প্রাধান্য পেয়েছে। শ্রেণী শোষণ, সামাজিক অসঙ্গতি, কুসংস্কার সব কিছুর বিরুদ্ধে সোচ্চার তার কণ্ঠ। চরম বাস্তব সত্যেরই স্বপ্ন পুরুষ ছিলেন মানিক। তার 'কলম পেষা কেরানি' জীবনে পদ্মাকে নিয়ে সৃষ্টি গোটা উপন্যাস এবং বাংলা সাহিত্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ বটে- 'পদ্মা নদীর মাঝি'।

'শহরে, গ্রামে, রেলস্টেশনে ও জাহাজঘাটে শান্ত মানুষ চোখবুজিয়া ঘুমাইয়া পড়ে। শেষ রাতে ভাঙা ভাঙা মেঘে ঢাকা আকাশে ক্ষীণ চাঁদটি উঠে। জেলে নৌকার আলোগুলো তখনো নেভে না।'

এই গ্রন্থের কোথাও কোনো আতিশয্য নেই, সুখ-দুঃখ আপন গতিতে সাবলীল স্বমহিমায়, কোথাও একটুও অতিরঞ্জন নেই। ধীবর প্রধান গ্রামে হিন্দু-মুসলিমের সহাবস্থান। প্রত্যেকেরই একটাই ঐশ্বর্য, একটাই অহঙ্কার, একটাই অলঙ্কার_সেটা দারিদ্র্যের। ধীবর সমাজের চালচিত্রে ধরা পড়েছে ধীবর মেয়েদের স্বভাব নিয়ে একটু কানাঘুষো চর্চাও। ভীতু কুবের মাঝির জীবনে নিত্য অনটন আর প্রেমের এক বিরামহীন প্রতিযোগিতা চলে। স্ত্রী মালা আর শ্যালিকা কপিলা_দুটি যেন সেই চরিত্র যারা যথার্থ রূপকও। একদিকে মালা স্থির, অচল এবং নিশ্চিত অসহায়, অন্যদিকে কপিলা অস্থির, ছুটন্ত ও অনিশ্চিত। কুবেরের মন ছিল উপবাসী আর কপিলার দেহ মন দুই-ই।

শহুরে সমাজের আড়ম্বর এই ধীবরদের কাছে ভয়ের কারণ। জমিদারের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বাণীও ব্যর্থ হয়। এই কেতুপুর গ্রামে দুই ধর্মের ভালোবাসা থাকলেও ছোঁয়াছুঁয়ির বিচারও আবার আছে। তবে বিপদের সময় তারা ভদ্র সমাজের মতো গোঁ ধরে সেই জাত বিচারকে আঁকড়ে ধরে সঙ্কট আরও ঘনীভূত করে না। তখন দুঃখী মুসলিম তরুণীকে শুদ্ধ কাপড়েই জড়িয়ে ধরে হিন্দু জেলে নারী। 'বঙ্গ সাহিত্যের উপন্যাসের ধারা' গ্রন্থে 'পদ্মা নদীর মাঝি' সম্পর্কে শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন' 'এই উপন্যাসটির সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ হইতেছে ইহার সম্পূর্ণ রূপে নিম্নশ্রেণী, অধ্যুষিত গ্রাম্য জীবনের চিত্রাঙ্কনে সূক্ষ্ম ও নিখুঁত পরিমিতিবোধ, ইহার সঙ্কীর্ণ পরিধির মধ্যে সনাতন মানব প্রবৃত্তিগুলোর ক্ষুদ্র সংঘাত ও মৃদু উচ্ছ্বাসের যথাযথ সীমা নির্দেশ।' আসলেই কুবের-কপিলার তথাকথিত অসামাজিক প্রেম, অন্ত্যজ জীবনযাত্রা এগুলোতে যৌনতার চিত্রায়নের লোভনীয় উপকরণ থাকলেও লেখক তা ব্যবহারে দুরন্ত শিল্পজ্ঞানের পরিচয় দিয়েছেন, যার উদাহরণ সমগ্র বাংলা সাহিত্যে খুব কম।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ-সৃষ্ট পদ্মার চরিত্রগুলো কবির অন্তর্দৃষ্টিতে মুহূর্তের আলোকে সত্য হয়ে উঠেছে আর সেই সত্য ছিল সংবেদনশীলতায় ভরা। অপরদিকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার সৃষ্ট পদ্মার গ্রাম্য নিচস্থ শ্রেণীর চরিত্রগুলোর অন্তরের অন্তস্থলে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাদের যথার্থ সীমা নির্দেশ করেছেন। ফলে বাস্তবের সাথে একাত্ম হয়েই তারা প্রকৃত অসহায়।

একজন শ্রেষ্ঠতম কবির দোয়াত-কলমে পদ্মা আর একজন কম্যুনিস্ট লেখকের শ্রেণীদৃষ্টির আলিঙ্গনে পদ্মা অপার হয়ে ফুটে উঠেছে বাংলা সাহিত্যে।
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত