নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, শুক্রবার ১২ জুলাই ২০১৯, ২৮ আষাঢ় ১৪২৬, ৮ জিলকদ ১৪৪০
ডিজিটাল বাংলাদেশে জলাবদ্ধতা আর কতকাল?
নজরুল ইসলাম লিখন
'আহারে জীবন, আহা জীবন, জলে ভাসা পদ্ম যেমন'- 'ডুব' সিনেমার এই গানটি যেন বাস্তব হয়ে হাজির হয়েছে চট্টগ্রামে। এখন সামান্য বৃষ্টিতেই পদ্মের মতো জলে ভাসে চট্টলা। বাণিজ্যিক রাজধানী বলা হলেও কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমরপানি মাড়িয়ে কর্মস্থলে যেতে হচ্ছে নগরীর ৫০ লাখ বাসিন্দাকে। জোয়ারের পানির সঙ্গে বৃষ্টির পানি একাকার হওয়ায় জলে ভেসেছে নগরী। অথচ চট্টগ্রামকে জলাবদ্ধতামুক্ত করতে তিনটি সংস্থাকে দিয়ে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। কিন্তু সংস্থাগুলোর কাজে সমন্বয় না থাকা, প্রকল্প কাজ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মনিটর না করা, প্রভাবশালীদের চাপে দখলদারদের উচ্ছেদ করতে না পারা এবং খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো খাল-নালা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করায় ভেস্তে যাচ্ছে সরকারি সব উদ্যোগ। শুধু তাই নয়, জলাবদ্ধতা নিরসনে বরাদ্দকৃত টাকাও যাচ্ছে ফেরত।

জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় একটি খবর পড়ে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। সাগরপাড়ের জনপদ কলাপাড়ায় দেড় শতাধিক গ্রামের লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। বিলম্বিত বর্ষার শুরুতেই কৃষকসহ সাধারণ এসব মানুষ পানি বন্দিদশায় পড়ে বিপদে পড়েছেন। প্রাকৃতিকভাবে তিন/চারদিনের টানা বৃষ্টিতে এভাবে জলাবদ্ধতা হওয়ার কথা নয়। মানবসৃষ্ট জলাবদ্ধতায় মানুষ এখন দিশাহারা হয়ে পড়েছে। কৃষক পারছে না বীজতলা তৈরি করতে। গবাদিপশুর ঘাস খাওয়ানোর সুযোগ নেই। ব্যবহারের পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ডুবে গেছে পুকুর, বাড়িঘর চলাচলের রাস্তা পর্যন্ত। পানি অপসারণের খাল ফ্রি-স্টাইলে দখল করে বাঁধ দিয়ে মাছের ঘের, পুকুর কিংবা সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল পেতে মাছ ধরায় পানি চলাচল করতে পারছে না। প্রায় ৩শ সস্নুইস সংযুক্ত খালের দশা একই। সস্নুইসের সামনে সরকারি দলের রাজনৈতিক ক্যাডাররা জাল পেতে মাছ ধরায় সস্নুইস খোলা-বন্ধে কৃষকের কোনো ভূমিকা নেই। তারা পড়েছেন জিম্মিদশায়। এ কারণে কৃষকসহ সাধারণ মানুষের সর্বনাশ দেখা দিয়েছে। আসছে আমন মৌসুমে চাষাবাদের বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা দেখা দিয়েছে। এসব জাল অপসারণ না করলে কৃষকরা আমনের বীজতলা করতে পারবে না। টিয়াখালী ইউনিয়নের সব খালে বাঁধ আর বাঁধ। যেন দখলের মহোৎসব চলছে। সব ক'টি ইউনিয়নের খালে বাঁধ দিয়ে জাল পাতা ছাড়াও কালভার্ট সস্নুইস গেটের নিয়ন্ত্রণ এখন সরকারি দলের একটি চিহ্নিত মহলের কাছে। তারা আবার এগুলো মাসোহারার বিনিময়ে মাছ ধরার লোকজনের কাছে অলিখিত ইজারা দিয়েছে বলে ব্যাপক জনশ্রুতি রয়েছে। ভুক্তভোগী মানুষ সরকারের হস্তক্ষেপে এমনতর জনবিরোধী কর্মকা- বন্ধের দাবি করেছেন।

হায়রে বৃষ্টি! হলেও সমস্যা, না হলেও সমস্যা। বৃষ্টি না হলে খরা, আর হলে জনদুর্ভোগ, বন্যা। প্রকৃতি এখন কি করবে, তা সে নিজেও জানে না। এক সময় সারা বাংলাদেশের জনগণ বৃষ্টির জন্যে 'আল্লাহ মেঘ দে পানি দে'- বলে ফরিয়াদ করেছিল। আর এখন বৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্যে ফরিয়াদ করছে। বর্ষাকালে বৃষ্টি হবে এটাই স্বাভাবিক। রোদ এবং বৃষ্টির লোকচুরি খেলা এদেশের জনগণ ভালোই উপভোগ করে। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের নিম্নাঞ্চলে দেখা দেয় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। বিভিন্ন এলাকা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ডুবে থাকে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানিতে। এসব এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাসাবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পানিতে সয়লাব হয়ে যায়। নগরী যেন ভাসছিল পানিতে। সড়ক রূপ নিয়েছিল খালে। বেশকিছু সড়কে বন্ধ হয়ে যায় যানবাহন চলাচল। এসব সড়কে পানির প্রচ- স্রোতে হেঁটে চলাচল করাও হয়ে পড়ে অসম্ভব। ঘর থেকে যারা বের হয়েছিলেন, তাদের পথে পথে পোহাতে হয়েছে সীমাহীন দুর্ভোগ। বিশেষ করে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, অভিভাবক, চাকরিজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের ভোগান্তির শেষ ছিল না। অনেকে বাসাবাড়িতে দিনভর পানিবন্দি হয়ে পড়েছিলেন। মুরাদপুর ফ্লাইওভারের নিচে জলাবদ্ধতা ছিল সবচেয়ে বেশি।

পত্রিকা সূত্রে জানা যায়, নগরীর ওয়াসার মোড়, বাকলিয়ার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ, আগ্রাবাদ সিডিএ, হালিশহর, অঙ্েিজন, বহদ্দারহাট, চকবাজার, মুরাদপুর, ষোলশহর ২নং গেট, চান্দগাঁও, মোহরাসহ নগরীর অনেক এলাকা বৃষ্টির পানিতে সয়লাব। বিভিন্ন স্থানে সড়কে বৃষ্টির পানি জমে যাওয়ায় যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পাশাপাশি ফ্লাইওভারগুলোয়ও জমে বৃষ্টির পানি। টিভিতে দেখা যায় হাসপাতালের অভ্যন্তরে পানি। রোগীরা চরম আতঙ্কে রয়েছে। সড়কের কোথাও কোথাও কোমরপানির কারণে যানবাহন চলাচল দূরে থাক, হেঁটেও যাতায়াত করা সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় রিকশা ও ভ্যানে করে জলমগ্ন এলাকা পাড়ি দিচ্ছেন মানুষ। এ সুযোগে রিকশাচালকরা ভাড়া হাঁকাতে থাকেন ইচ্ছেমতো। ২০ টাকার ভাড়া নিচ্ছেন ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। ফলে দেখা দেয় চরম ভোগান্তি।

টানা দুই দিনের বৃষ্টিতে নগরীর নিম্নাঞ্চলের হাসপাতালেও জমেছে হাঁটুপানি। আগ্রাবাদের মা ও শিশু হাসপাতালের নিচতলা হাঁটুপানির নিচে, জরুরি বিভাগও তলিয়ে গেছে পানিতে। চিকিৎসাসেবা নিতে আসা মানুষকে এ সময় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। জলাবদ্ধতার কারণে হালিশহরের মাদার অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার হাসপাতাল এবং সাউথ পয়েন্ট হাসপাতালে আসা রোগীদেরও পোহাতে হয়েছে ভোগান্তি। জরুরি বিভাগে এসেও চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে অনেকে। যেসব রোগী হুইলচেয়ার ব্যবহার করে হাসপাতালে আসা-যাওয়া করেন, চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে তাদের।

রাজধানী ঢাকার অবস্থা আরও নাজুক। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোঁমরপানি, কোথাও আবার ঠাঁই পাচ্ছে না মানুষ। গোটা ঢাকা শহর যেন জলে ভাসমান শহর। দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। কৃষকদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। নদী মার্তৃক আমাদের এই দেশে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত আশীর্বাদস্বরূপ হলেও অতিবর্ষণ কেবলই দুর্ভোগ বয়ে আনে। অতিবর্ষণে নদীগুলো নবযৌবন লাভ করে প্রমত্তা হয়ে ওঠেছে। আমরা আগে থেকে সাবধান হই না। চোর পালালে আমাদের বুদ্ধি আসে। বিপদ চলে গেলে আমাদের সতর্কতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

রিকশাচালকদের সড়ক অবরোধ ও বৃষ্টিপাতে জলাবদ্ধতার ফলে রাজধানীর বেশির ভাগ সড়ক তীব্র যানজটে অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে গণপরিবহণের সঙ্কট, অ্যাপভিত্তিক পরিবহণে বাড়তি ভাড়ার কারণে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। সকাল ৭টা থেকে রিকশাচালকরা অবরোধ করলে মুগদা হয়ে মালিবাগ-রামপুরা-প্রগতি সরণি-কুড়িল প্রধান সড়কে গণপরিবহণের সঙ্কট দেখা দেয়। তুরাগ, লাব্বাইক, ছালছাবিলসহ বিভিন্ন পরিবহণের বেশিরভাগ বাস চলাচল বন্ধ থাকে। বিকল্প পথে ঘুরে দ্বিগুণ বা তারও বেশি সময় সড়কে যানজটে থেকে গন্তব্যে যেতে হয় অনেক যাত্রীকে। দুপুরে প্রবল বর্ষণ শুরু হলে প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে পানি জমে গাড়ির গতি আরো কমে যায়। এতে দুর্ভোগের মাত্রা আরো বাড়ে। বিশেষ করে দিন শেষে কর্মস্থল থেকে ফিরতে যানজটের সঙ্গে তীব্র পরিবহণ সঙ্কটে পড়তে হয় ঘরমুখো নাগরিকদের। বাসের দূরত্ব রিকশায়, এমনকি হেঁটে পেরোতে হয় তাদের।

আবহাওয়া অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ওইদিন দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাত হয় ৩৮ মিলিমিটার। দুপুর আড়াইটা থেকে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল বেশি। দুপুর প্রায় আড়াইটায় বৃষ্টি শুরু হলে বিভিন্ন রুটে চলাচলরত বাসের গতি মন্থর হয়ে যায়। পল্লবী-কালশী সড়কেও পানি জমেছিল। এমনিতেই উন্নয়ন কাজের জেরে সড়কের বড় অংশ স্থানে স্থানে বন্ধ। তার ওপর জলকাদা জমে থাকায় যানবাহনের গতি ছিল ধীর। মিরপুর-১২ নম্বর থেকে আগারগাঁও অংশে মেট্রো রেলপথের নির্মাণকাজ চলছে। দুপুরে তুমুল বৃষ্টি শুরু হলে প্রকল্প এলাকায় মূল সড়কের পাশে পানি জমে যায়। নিত্যকার গা সওয়া যানজট এখানে চরম রূপ নেয়। পানি জমেছিল মগবাজার, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, খিলক্ষেত, মিরপুরের বিভিন্ন সড়কেও। গাবতলী-আসাদগেট-আজিমপুর, সায়েন্সল্যাব-শাহবাগ, কুড়িল-রামপুরা-খিলগাঁও-সায়েদাবাদ সড়কে রিকশাসহ অন্যান্য অবৈধ ও অননুমোদিত যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

বৃষ্টির পানি আর ড্রেনেজের অস্বাস্থ্যকর পানি মিশে একাকার হয়ে গেছে। নিচু এলাকায় অনেকের বাড়ি ঘরে দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা পানি প্রবেশ করেছে। বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে ঢাকা শহর। রাস্তায় ময়লাযুক্ত পানি, বাতাসে দুর্গন্ধ এ যেন মৃত্যুপুরী। পানির জন্যে মানুষ যাতায়াত করতে পারছে না। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা বড় বিপদের মধ্যে রয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই যেতেই পারছে না। অফিসগামী চাকুরেরা নেহায়েত বিপদের মধ্যেই অনেক ভোগান্তি নিয়ে কর্মস্থলে যাচ্ছেন। রাস্তায় পানির কারণে যান চলাচল প্রায়ই বন্ধ রয়েছে। আধা মিনিটের রাস্তা পাড়ি দিতে সময় লাগে আধা ঘণ্টা। তাও আবার রিকশাভাড়া গুণতে হচ্ছে অতিরিক্ত দশ টাকা।

চট্টগ্রামকে জলাবদ্ধতামুক্ত করতে সবচেয়ে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে। মোট পাঁচ হাজার ৬১৬ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা প্রকল্প ব্যয় ধরে সর্বশেষ অর্থবছরে তাদের বরাদ্দ দেয়া হয় ৮৫০ কোটি টাকা। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় এ বরাদ্দ থেকে ফেরত গেছে ৪২৫ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছরেও বরাদ্দকৃত ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে তারা খরচ করতে পেরেছিল মাত্র দেড়শ কোটি টাকা। ফেরত গিয়েছিল বাকি টাকা। চউকের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হওয়া মেগা প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ২০২০ সালের জুনে। এ প্রকল্পের অধীনে ৩৬টি খালের মাটি অপসারণ, ছয় হাজার ৫১৬ কাঠা ভূমি অধিগ্রহণ, নতুন ৮৫ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করা হবে। ১৭৬ কিলোমিটার আরসিসি রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, ৪৮টি পিসি গার্ডার ব্রিজ প্রতিস্থাপন, বন্যার পানি সংরক্ষণে তিনটি জলাধার, ছয়টি আরসিসি কালভার্ট প্রতিস্থাপন, পাঁচটি টাইডাল রেগুলেটর, ১২টি পাম্প হাউস স্থাপন, ৪২টি সিল্টট্রেপ স্থাপন ও ২০০টি ক্রস ড্রেন কালভার্টও নির্মাণ করার কথা। কিন্তু গত এক বছরে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই এ প্রকল্পে। শুধু খাল খননের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তাদের প্রথম বছরের কার্যক্রম। নগরীর ১৩টি খালে এক হাজার ৫৭৬টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করেছে তারা। এসব স্থাপনা বেদখল করে রেখেছে ১২৩ একর ভূমি। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) প্রতিষ্ঠান জরিপ করে এসব অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করলেও প্রভাবশালীদের চাপে এখনও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে পারেনি চউক। অথচ সামান্য বৃষ্টিতেই কোমরপানিতে ডুবে যাচ্ছে চট্টগ্রাম।

শুধু চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নয়, চট্টগ্রামকে জলাবদ্ধতামুক্ত করতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনও। বহদ্দারহাট বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী পর্যন্ত নতুন খাল খনন প্রকল্প গ্রহণ করেছে তারা এক হাজার ২৫৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে। ২০১৪ সালে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটের বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত নতুন খাল খননের এ প্রকল্প অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (একনেক)। প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ছিল ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত। অথচ প্রকল্পের কাজ এখনও শুরুই হয়নি। কাজ শুরু করতে গড়িমসি হওয়ায় এ প্রকল্পের ব্যয় এরই মধ্যে বেড়ে গেছে চার গুণ। শুরুতে এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩২৬ কোটি টাকা।

এদিকে নগরীকে জলাবদ্ধতামুক্ত করতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ১ হাজার ৬২০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে আরও একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। মহানগরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধতা নিরসন ও নিষ্কাশন উন্নয়ন শীর্ষক এ প্রকল্পের অধীন কর্ণফুলী নদীতে পড়া ২৩টি, হালদায় তিনটি এবং বঙ্গোপসাগরে পড়া ১৪টি খালের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ৬৯টি পাম্প হাউস নির্মাণ করা হবে। এসব খাল সুরক্ষিত করতে নির্মাণ করা হবে রিটেইনিং ওয়াল, যার দৈর্ঘ্য হবে দুই দশমিক ৭০ কিলোমিটার। পাম্প হাউসের কাজ নিরবচ্ছিন্ন করতে জেনারেটর ও রেগুলেটর স্থাপন করা হবে। এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে স্থাপন করা হবে সাতটি জেনারেটর। পাশাপাশি রেগুলেটর স্থাপন করা হবে ২৩টি। অধিগ্রহণ করা হবে ছয় হেক্টর ভূমি। এ প্রকল্পটি এরই মধ্যে একনেকে অনুমোদন হয়েছে। এ প্রকল্পের কাজ শিগগির শুরু হলেও এ বর্ষায় এটি থেকেও কোনো সুফল পাবে না নগরবাসী।

মানুষের দুর্ভোগ যেন আর কাটে না। ভারি বর্ষণে নানা দুর্ভোগে জনজীবন অচল হয়ে পড়েছে। গত কয়েক দিনের ভারি বর্ষণে রাজধানী ঢাকা শহরের যে বিপর্যস্ত অবস্থা তা আমাদের অপরিণামদর্শিতাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। ঢাকা শহরের আশপাশের খাল-বিল, নদী-নালা ও জলাশয়গুলো ভরাট করে আমরাই সুরম্য অট্টালিকা গড়ে তুলেছি। ময়লা-আবর্জনা ফেলে ড্রেনেজ ব্যবস্থা একেবারে বন্ধ করে রেখেছি। এখন টানা বৃষ্টিতে পানি সরবে কোথায়? তাই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাল ও নর্দমা দখল হয়ে যাওয়া, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ সিস্টেম গড়ে ওঠা, নিয়মনীতি না মেনে যত্রতত্র ভবন নির্মাণ করা এবং পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়া এই জলাবদ্ধতার উল্লেখযোগ্য কারণ। রাজধানী ঢাকা ও বন্দর নগরী চট্টগ্রাম এই দুই মহানগরীর ড্রেনেজ সিস্টেম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। পলিথিনসহ অপচনশীল ময়লা-আবর্জনা ড্রেনেজ সিস্টেমকে মূলত অচল করে দিয়েছে।

যত অপরিকল্পিত ও দুর্বল ড্রেনেজ সিস্টেমই থাকুক না কেন, তা যদি সচল ও কার্যকর থাকতো তাহলে সামান্য বৃষ্টির পানিতে এরকম ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হত না। ঢাকার স্ট্রম স্যুয়ারেজের অনেক গালভরা গল্প শোনা গেছে। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো কার্যকরিতা আজ অবধি দেখা যায়নি। চট্টগ্রামে ড্রেনেজ মাস্টারপ্লান এখনও কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ হয়ে রয়েছে। ড্রেনেজ সিস্টেম যতটা সম্ভব সচল রাখা, নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যবহার থেকে সবাইকে বিরত রাখা এবং যথাসময়ে ড্রেনের বর্জ্য-আবর্জনা পরিষ্কার করার কথা বিভিন্ন মহল থেকে বারবার বলা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এদিকে নজর দেয়ার প্রয়োজনই বোধ করেননি।

মানবসৃষ্ট এই ধরনের দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেতে হলে এলাকার মানুষকে সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে। যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা বন্ধের পাশাপাশি সরকাররি জমি দখলমুক্ত করতে হবে। দখলকৃত খাল ও পয়োনিষ্কাশনের নর্দমাগুলো উদ্ধার করার জন্যে সরকারি উদ্যোগও অপরিহার্য। তাই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে অনতিবিলম্বে। উচ্ছেদ করতে হবে অবৈধভাবে খাল ও নর্দমা দখলকারীদের। প্রকৃতির সাথে সহাবস্থানের জন্যে চাই সুষ্ঠু পরিকল্পনা। পাহাড়খেকো ভূমিদস্যুদের অপকর্মের ফল ভোগ করছে নিরীহ জনসাধারণ। কিন্তু এই অবস্থা বেশি দিন চলতে দেয়া যায় না। এখনই প্রতিরোধ করতে হবে। পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হবে। এখনই উদ্যোগ নেয়া দরকার, যাতে ভবিষ্যতে অতিবর্ষণে বাংলাদেশের মানুষের জীবন স্থবির হয়ে না পড়ে। পাহাড় ধসে আর যেন কোনো মানুষের মৃত্যু সংবাদ না পাওয়া যায়। জলাবদ্ধতা যেন তৈরি না হয়।

নজরুল ইসলাম লিখন : কলামিস্ট ও সাংবাদিক

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
আজকের নামাজের সময়সূচীনভেম্বর - ৭
ফজর৫:০৭
যোহর১১:৫০
আসর৩:৩৬
মাগরিব৫:১৫
এশা৬:৩২
সূর্যোদয় - ৬:২৭সূর্যাস্ত - ০৫:১০
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
৪৮১৫.০
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদক : আহ্সান উল্লাহ্। উপদেষ্টা সম্পাদক : মোঃ শাহাবুদ্দিন শিকদার। প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ৯৩৫৭৭৩০ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ djanata123@gmail.com, bishu.janata@gmail.com
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.