নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, মঙ্গলবার ১৭ এপ্রিল ২০১৮, ৪ বৈশাখ ১৪২৫, ২৯ রজব ১৪৩৯
বাংলা নববষের্র অনুষঙ্গ
জাহিদ হোসেন
নববর্ষ উদযাপনে দিন দিন নিত্য নতুন অনুষঙ্গ যুক্ত হচ্ছে এবং আমাদের সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতির সাথে তা মিশে যাচ্ছে। বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ সৌরপঞ্জিকা ভিত্তিক বর্ষপঞ্জি। বাংলাদেশ এবং পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা অঞ্চলে এই বর্ষপঞ্জি ব্যবহৃত হয়। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ঋতু বৈচিত্র্যকে ধারণ করবার কারণে বাংলা সনের জনপ্রিয়তা এসেছে। বঙ্গাব্দের সূচনা সম্পর্কে দু'টি মত আছে ? প্রথম মত অনুযায়ী প্রাচীন বঙ্গদেশের (গৌড়) রাজা শশাঙ্ক (রাজত্বকাল আনুমানিক ৫৯০-৬২৫ খৃষ্টাব্দ) বঙ্গাব্দ চালু করেছিলেন। দ্বিতীয় মত অনুসারে, উপমহাদেশে মুসলিম শাসন প্রবর্তিত হওয়ার পর থেকেই রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো হিজরি সন। ১২০১ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি কর্তৃক বঙ্গ বিজয় এর পর থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ব্যবহৃত হতো হিজরি সন। দিলি্লর মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে বর্তমানে প্রচলিত বাংলা সনকে বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করা হয়। খাজনা আদায়ে শৃঙ্খলা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহ উল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। অন্য আরেকটি সূত্র বলছে, বাংলাদেশে মুসলিম আমলের আগে শশাংক কর্তৃক প্রবর্তিত শকাব্দ ও বিক্রমাব্দ সহ বিভিন্ন ধরনের সন গণনা প্রবর্তিত ছিল। আকবরের বাংলা ক্যালেন্ডার চালু হওয়ার পরও এই বাংলাদেশেই অন্যতম প্রচলিত ক্যালেন্ডার ছিল শকাব্দ বা শালিবাহন বর্ষ।

মুসলিম পূর্ব ভারতবর্ষে বিভিন্ন সন প্রচলিত ছিল। বাংলায় তখন যে সন প্রচলিত ছিল তার প্রথম দিন ছিল ১লা অগ্রহায়ণ। হায়ন শব্দের অর্থ বছর বা সূর্যের একটি পরিক্রমন এর সময়। এ কারণে সম্রাট আকবরের সময় প্রচলিত বাংলা সনের আগে বাংলাদেশে নববর্ষ উদযাপিত হতো ১লা অগ্রহায়ণ। এছাড়া কার্তিক ও চৈত্র মাসকেও বিভিন্ন সময় বছরের প্রথম মাস হিসেবে নির্ধারণের প্রমাণ পাওয়া যায়। আকবরের সময়কাল থেকে পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। আমাদের বাংলাদেশে যে আধুনিক বাংলা বর্ষ প্রবর্তিত রয়েছে, তা মূলত বাংলা একাডেমী কর্তৃক বাংলা সন সংশোধিত বর্ষ গণনা প্রক্রিয়া যার মূল প্রোথিত রয়েছে ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬ সালে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ'র নেতৃত্বে এ কমিটি বিভিন্ন বাংলা মাস ও ঋতুতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থ সাংস্কৃতিক জীবনে কিছু সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতাকে নির্ণয় করে সেগুলো হতে উত্তরণের প্রস্তাবাবলী প্রদান করেন। বাংলা সনের ব্যাপ্তি গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জির মতোই ৩৬৫ দিনের। যদিও সেখানে পৃথিবীর সূর্যকে প্রদক্ষিণের পরিপূর্ণ সময়কেই যথাযথভাবে নেয়া হয়েছে। এ প্রদক্ষিণের মোট সময় ৩৬৫ দিন ৫ ঘন্টা ৪৮ মিনিট এবং ৪৭ সেকেন্ড। এই ব্যবধান ঘোচাতে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে প্রতি চার বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি অতিরিক্ত দিন যোগ করা হয়। ব্যতিক্রম হচ্ছে সে শতাব্দীতে যে শতাব্দীকে ৪০০ দিয়ে ভাগ করা যায় না বা বিভাজ্য। জ্যোতির্বিজ্ঞান নির্ভর হলেও বাংলা সনে এই অতিরিক্ত দিনকে আত্মীকরণ করা হয়নি। বাংলা মাস অন্যান্য সনের মাসের মতোই বিভিন্ন পরিসরের। এই সমস্যাগুলোকে দূর করবার জন্য ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কমিটি বাংলা একাডেমির কাছে কতকগুলো প্রস্তাব করে । এগুলো হচ্ছে- ১। বছরের প্রথম পাঁচ মাস বৈশাখ হতে ভাদ্র হবে ৩১ দিনের; ২। বাকী মাসগুলো অর্থাৎ আশ্বিন হতে চৈত্র হবে প্রতিটি ৩০ দিনের মাস; ৩। প্রতি চতুর্থ বছরের ফাল্গুন মাসে একটি দিন যোগ করে তা হবে ৩১ দিনের; বাংলা একাডেমী সরকারিভাবে এই সংশোধিত বাংলা মাসের হিসাব গ্রহণ করে ।

আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকা-ের উল্লেখ পাওযা যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সনের আগে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয়নি। ১৯৬০ এর দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা। ১৯৮৯ সাল থেকে শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর চারুকলা ইন্সটিটিউট থেকে 'মঙ্গল শোভাযাত্রা'। মূলত পহেলা বৈশাখ ছিল গ্রাম বাংলার একটি অবিচ্ছেদ্য জীবনাচারের অংশ, এদিন পুরাতন বছরের হিসেব চুকিয়ে নতুন বছরের হিসেব খোলা হত। গত দুই দশকে এই অনুষ্ঠানে কর্পোরেট বাণিজ্য এবং আমাদের যে কোন বিষয়ে মাত্রাতিরিক্ত আদিখ্যেতার জোয়ারে হারিয়ে গেছে গ্রামবাংলার পহেলা বৈশাখ, জন্ম নিয়েছে নতুন এক হাইব্রিড পহেলা বৈশাখ। যেখানে হাজার টাকায় পান্তা ইলিশ খাওয়া হয়, বৈশাখী কনসার্ট আয়োজন করা হয়, বৈশাখী ডিজে পার্টি, বৈশাখী ফ্যাশন শো হয়, আরও কত কি হয় তা আমার জানা নেই।

নতুন বছরের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ। গ্রামে মানুষ ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, নতুন জামাকাপড় পরে এবং আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে বেড়াতে যায়। বাড়িঘর পরিষ্কার করা হয় এবং মোটামুটি সুন্দর করে সাজানো হয়। বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। কয়েকটি গ্রামের মিলিত এলাকায়, কোন খোলা মাঠে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। মেলাতে থাকে নানা রকম কুটির শিল্পজাত সামগ্রীর বিপণন, থাকে নানারকম পিঠা পুলির আয়োজন। অনেক স্থানে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। এই দিনের একটি পুরনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। এর মধ্যে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা কিংবা কুস্তি একসময় প্রচলিত ছিল। বাংলাদেশে এরকম কুস্তির সবচেয়ে বড় আসরটি হয় ১২ বৈশাখ, চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে, যা জব্বারের বলি খেলা নামে পরিচিত।

হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বার মাস অনেককাল আগে থেকেই পালিত হতো। এই সৌর পঞ্জিকার শুরু হতো গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। হিন্দু সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরল, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হত। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, এক সময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হত। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ, কারণ প্রাযুক্তিক প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়া পর্যন্ত কৃষকদের ঋতুর উপরই নির্ভর করতে হত।

জাহিদ হোসেন : লেখক

এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
আজকের নামাজের সময়সূচীএপ্রিল - ২০
ফজর৪:১৪
যোহর১১:৫৮
আসর৪:৩১
মাগরিব৬:২৫
এশা৭:৪১
সূর্যোদয় - ৫:৩৩সূর্যাস্ত - ০৬:২০
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
২৫১৭.০
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদক : আহ্সান উল্লাহ্। উপদেষ্টা সম্পাদক : মোঃ শাহাবুদ্দিন শিকদার। প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ৯৩৫৭৭৩০ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ djanata@dhaka.net
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.