নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪২০, ২৬ রবিউস সানি ১৪৩৫
গোবিন্দগঞ্জের শিল্প-কারখানা
লোকমান ফারুক
গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা বাসস্ট্যান্ডে নেমে মহিমাগঞ্জের রাস্তাধরে কিছুদূর এগুলেই বসতবাড়ি লাগোয়া ঘিঞ্জি পরিবেশে গড়ে উঠা সুয়েটার, মাফলার ও পায়ের মোজা তৈরির শতাধিক গার্মেন্টস ও হোসিয়ারি কারখানা। উপজেলার মধ্যে পাড়া, কোচাশহর, বনগ্রাম, ধারাইকান্দি, পশ্চিম পন্থাপাড়া ও শক্তিপুরে রাস্তার দু'ধারে এসব কারখানার অবস্থান। সুযোগ-সুবিধার কথা ভাবলে কারখানা বলার সুযোগ নেই, তবুও কারখানা। বসতবাড়ি সংলগ্ন কিংবা বাড়ি ছোঁয়া কারখানাগুলোয় কাজ করছেন ৪০/৫০ হতে ১০০, কোথাও ২০০ জন শ্রমিক। এদের বেশিরভাগই পুরুষ। নারী শ্রমিকের সংখ্যা ২০ হতে ২৫ ভাগ। এখানকার তৈরি মালামাল উত্তরের জেলাগুলোতে খুচরা পাইকারদের কাছে বিক্রি ও বায়ারদের অর্ডার সরবরাহ করা হয়। মালিকরাও সবাই স্থানীয়। শ্রমিকদের কারও বাড়ি কারখানা সংলগ্ন, কারও বাড়ি আশপাশ এলাকায়। এই শ্রমিকরা কাজ করেন দৈনিক ১২ ঘণ্টা, কোথাও তার চেয়েও বেশি। মালিক কর্তৃক শ্রমিকদের নিয়োগপত্র বা ছবিসহ পরিচয়পত্র প্রদান করা হয়নি। তারা গার্মেন্টস শিল্পের জন্য মজুরি কাঠামো অনুসরণ করেন না। আর প্রাপ্ত মজুরির হার নিয়ে শ্রমিকরাও অসন্তুষ্ট। শ্রমিকদের ওভার টাইম ভাতা নেই, ঈদ পূজা-পার্বণে বোনাস দেন না, তবে কেউ কেউ বকশিশের নামে ১/২শ টাকা দেন বলে জানা গেল। দীর্ঘ সময় ধরে কারখানা চললেও শ্রম পরিদর্শন ব্যবস্থার দায়িত্বশীল ব্যক্তিগণ এসব কারখানায় মালিকদের লাইসেন্স গ্রহণ বা কর্ম পরিবেশ উন্নয়নের প্রতি নজর দেননি। ২০১২ সালে প্রথম একজন কারখানা পরিদর্শক, কারখানাগুলো সরেজমিন তদন্ত করে শ্রম আইন লঙ্ঘনের দায়ে কয়েকটি কারখানার বিরুদ্ধে মামলা দেয়ায়, ঐইসব কারখানার মালিক শ্রম আদালতে জরিমানা দ-ে দ-িত হলেও পরিস্থিতির উন্নয়ন বা কারখানার লাইসেন্স গ্রহণে উদ্যোগী হওয়া দূরের কথা, উল্টো বিধিমোতাবেক এসব গ্রহণ, পালন করার দায় এড়াতে, তাদের হয়ে উপজেলার একজন ভাইস চেয়ারম্যানকে দিয়ে ভীতিকর প্রভাব খাটানোরও অভিযোগ রয়েছে।

শ্রম আইনানুযায়ী কারখানার নকশা অনুমোদন, নির্মাণ ও শ্রমিক সংখ্যানুপাতে সরকারি ফি জমা দিয়ে উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরুর পূর্বে রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বছরের পর বছর উৎপাদন প্রক্রিয়া অব্যাহত এবং কারো কারো ব্যবসায় প্রসার ঘটলেও কারখানার লাইসেন্স গ্রহণ, ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা হতে উত্তরণ ও শ্রমিকদের নূ্যনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ওয়াকিফহাল মহলের সাথে কথা বলে জানা গেল, গত ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৩ তারিখে রায়হান গার্মেন্টস এন্ড হোসিয়ারির গুদাম ঘরে আগুন লেগে মালামাল ও মেশিনপত্র পুড়ে যাওয়ার ঘটনায়, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের উপ-প্রধান পরিদর্শক (সা.) এর নির্দেশে রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের একজন কারখানা পরিদর্শক ঘটনা তদন্ত ও কারখানাগুলোর অভ্যন্তরীণ অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় তিনি কারখানাগুলোয় লাইসেন্স গ্রহণ করার বিষয়ে পদক্ষেপ নিলে উপজেলার পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যান ঐ পরিদর্শককে থামিয়ে দিতে তার প্রভাব খাটান। ভাইস চেয়ারম্যান সাহেব তার নির্বাচনী এলাকার ১০০ মালিককে শ্রম আইন মেনে চলার দায়মুক্তি দিতে তৎপর হলেও ওই মালিকদের অধীনে নিয়োজিত ৫ হাজার শ্রমিক ভোটারের কর্ম পরিবেশ উন্নয়নে কেন উদাসীন? তা রহস্যজনক বটে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই লেখক ভাইস চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলার জন্য তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।

আমি যখন শ্রমিকদের সাথে কথা বলি, তারা তাদের জীবন-যাতনার কথা অকপটে স্বীকার করে বলেন, বেশি খাটাউক কিন্তু মজুরিটা বাড়ায়া দিলে একটু ভালো চলতে পারতাম। দৈনিক খাওয়া, পোশাক পরিচ্ছদ, চিকিৎসা, ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ এসবে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। একজন মহিলা শ্রমিক, সংসারে স্বামীর সাহায্য হয় এই আশাতেই কাজে যোগ দিলেও স্বল্প বেতনের দরুন অভাব নিত্যসঙ্গি হওয়ায়, তার হতাশার কথাও বলেছেন। শ্রমিকদের এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মালিকদের জবাব, ব্যবসা ভালো নয়, শ্রমিকদের বেতন বাড়াবো কীভাবে?

যে কোনো শিল্প কারখানা ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং ব্যবসা করতে হলে ট্রেড লাইসেন্স ও পরিবেশের ছাড়পত্র নেয়া বাধ্যতামূলক। এসব নিয়ম অমান্য করা হলে তার শাস্তিও কঠোর। কিন্তু শ্রম আইনের জরিমানা দন্ড ১৫শ হতে ৫ হাজার টাকা। তাও আবার এসব মামলা প্রথম না দ্বিতীয় অভিযোগ তা আবেদনে উল্লেখ থাকে না। মামলা দায়েরের এই অবহেলাজনক প্রক্রিয়া ও দ-ের বিধান কম হওয়ায়, শ্রম আইন মানার ব্যাপারে মালিক পক্ষ উদাসীন। একজন আইনজীবীর মতে শ্রম আইন বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক হলে দ-ে বিধানগুলো পূর্ণ মূল্যায়ন করা দরকার। অপরদিকে রয়েছে সমন্বয়হীনতা। আমাদের বড়, মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীগণ কমবেশি সবাই ব্যাংকে লেনদেন করেন। ব্যাংকে হিসাব খোলা বা ঋণ গ্রহণের সময় শুধু ট্রেড লাইসেন্সকে গুরুত্ব দেয়ায় অন্যগুলো কারখানা মালিকদের কাছে গুরুত্বহীন। এ ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্সের সাথে পরিবেশ ছাড়পত্র ও কারখানা লাইসেন্স ব্যাংকে দাখিল করার নিয়ম চালু করা এবং ছাড়পত্র ও লাইসেন্স প্রদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করা যায় কি না? যাতে ছাড়পত্র ও কারখানা লাইসেন্স গ্রহণ করার পর ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করা হয়। এতে লাইসেন্স গ্রহণ করার দায় সৃষ্টি হতে পারে।

শ্রম আইনানুযায়ী শ্রমিকদের নিয়োগপত্র ও ছবিসহ পরিচয়পত্র প্রদান, দৈনিক কার্যকাল ৮ ঘণ্টা নির্ধারণ করা, ওভার টাইম কাজের ওভার টাইম ভাতা প্রদান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মজুরি পরিশোধ করা, মহিলা শ্রমিকদের জন্য সীমিত কর্মঘণ্টা ও মজুরি কাঠামো মেনে চলা মালিকগণের দায়িত্ব। আরও বেশি দায়িত্ব উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরুর ৩০ দিন পূর্বে কারখানার রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স গ্রহণ করা। কিন্তু গোবিন্দগঞ্জের গার্মেন্টস ও হোসিয়ারি মালিকগণ যদি বছরের পর বছর ধরে কারখানা লাইসেন্স গ্রহণ না করেই সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার অপচেষ্টায় সফল হন। তাহলে সেই শ্রম অধিদফতর সহায়তায় শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা বাস্তবায়নের আশা করা যায় কী? সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে একজন কারখানা পরিদর্শক মালিকগণকে লাইসেন্স গ্রহণ করাতে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করার পর, এলাকার একজন জনপ্রতিনিধি মালিকগণের পক্ষ হয়ে সেই কর্মকর্তাকে থামিয়ে দিতে তৎপরতা দেখান, এ বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানানো হলেও বিভাগীয় দফতর হতে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে মাঠে মারা পরেছে কারখানার লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়াটি। শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সাবেক ও বর্তমান অনেক নেতাই আমাকে বলেছেন, মাঠ পর্যায়ে ভালো কাজ করতে গিয়ে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়া পরিদর্শকগণকে সুরক্ষা দেয়া ও আরো কঠোর পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করার পরিবর্তে, বিভাগীয় অফিসের নীরবতা একটি ব্যাধি। এ ব্যাধি সাড়ানো না গেলে কাজীর গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে তার অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না।

গোবিন্দগঞ্জে একশ্রেণির গার্মেন্টস ও হোসিয়ারি মালিক রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার উদ্দেশ্যে বহু বছর ব্যবসা করেও কারখানার লাইসেন্স গ্রহণ না করা ও সংকীর্ণ পরিসরে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টার দরুন, গড়ে উঠা কারখানাগুলো বেশি উৎপাদনে যেতে পারছে না। এ জন্য চাই স্বার্থান্ধ নেতাদের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত থাকা, কর্ম পরিবেশের উন্নতি এবং নিয়ম মেনে কারখানা পরিচালনা করা। এ লক্ষ্যে সরকারের নজরদারিও জোরদার করা আবশ্যক। আমরা মনে করি, উপজেলা সদরের অদূরে গড়ে উঠা এসব কারখানার মালিকগণের মানসিকতার পরিবর্তন ও সরকারি সহায়তা পেলে কোচাশহর, বনগ্রাম, ধারাইকান্দির এ এলাকাটি অদূর ভবিষ্যতে হয়ে উঠতে পারে শিল্প শহর।

লোকমান ফারুক : প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক


Fatal error: Uncaught exception 'PDOException' with message 'SQLSTATE[HY000]: General error: 26 file is encrypted or is not a database' in /home/janata/public_html/lib/newsHitCount.php:7 Stack trace: #0 /home/janata/public_html/lib/newsHitCount.php(7): PDO->query('Update newsHitC...') #1 /home/janata/public_html/lib/index.php(135): require('/home/janata/pu...') #2 /home/janata/public_html/web/details.php(10): lib->newsHitCount() #3 /home/janata/public_html/web/index.php(28): include('/home/janata/pu...') #4 /home/janata/public_html/index.php(15): include('/home/janata/pu...') #5 {main} thrown in /home/janata/public_html/lib/newsHitCount.php on line 7