নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা , সোমবার ২৮ জানুয়ারি ২০১৩, ১৫ মাঘ ১৪১৯, ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৪
অযত্ন অবহেলায় ধ্বংসের মুখে ৬শ' বছরের প্রাচীন মনসাবাড়ী
শরীয়তপুর থেকে বাসস
শরীয়তপুর পৌরসভার ধানুকা গ্রামে ইতিহাস ঐতিহ্যের প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মনসাবাড়ী। ঐতিহাসিকদের মতে, প্রায় ৬শ' বছরের প্রাচীন এ বাড়ীটি ঘিরে রয়েছে নানান কিংবদন্তী ও লোককথা। জেলার প্রাচীন ব্যক্তিরা এ বাড়ীকে ময়ূর ভদ্রের বাড়ী নামে ডেকে থাকেন। সুলতানী ও মোগল আমলের নির্মাণ শৈলীতে নির্মিত এ বাড়ীতে ৫টি ইমারত আছে যা এখন অযত্ন অবহেলায় ও দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে বিলুপ্ত হতে চলেছে। বাড়ীর ৫টি ইমারতের মধ্যে ছিল দুর্গা মন্দির, মনসা মন্দির, কালি মন্দির, নহবতখানা ও আবাসিক ভবন। কিংবদন্তি থেকে জানা যায়, তৎকালীন সময়ে সর্ববৃহৎ ও ব্যাপক আকারে এ অঞ্চলের মধ্যে একটিতেই মনসা পূজার আয়োজন হতো। আর এখানে পূজা দেয়ার জন্য ভারত বর্ষের বহু লোকের আগমন ঘটতো বলে বাড়ীটি মনসাবাড়ী হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এ বাড়ীর পাশে স্থাপিত ছিল মহিলা মনসা মন্দির ও শিব মন্দির। আরেক কিংবদন্তি থেকে জানা যায়, ভারতের কনৌজ থেকে তৎকালীন সময়ে ধনাঢ্য ভট্টাচার্য পরিবার ধানুকা অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন। তারা শিক্ষা, ধর্ম পরায়ণতা, অর্থ-বিত্তে সমৃদ্ধ ছিল বলে জানা যায়। আর তাদেরই পূর্ব পুরুষ ছিলেন ময়ূর ভট্ট। ময়ুর ভট্টের জন্ম বৃত্তান্তে জানা যায়, তিনি যখন মাতৃগর্ভে ছিলেন তখন তার পিতা-মাতা তীর্থের জন্য কাশীধামে যাত্রা করেন। সে সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা কি রূপ ছিল তা আজকের শরীয়তপুরবাসী কল্পনাও করতে পারবে না।

দীর্ঘ যাত্রা পথে ময়ুর ভট্ট এক বনের ধারে জন্মগ্রহণ করেন। তার ধর্মপরায়ণ জনক-জননী ধর্ম ও দেবতাকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে তারা পুত্রকে শাল পাতায় আচ্ছাদিত করে রেখে কাশীতে যাত্রা করেন। গন্তব্যে পৌঁছে পূজো দিয়ে রাতে ঘুমিয়ে তারা স্বপ্নের মাধ্যমে জানতে পারেন তাদের পূজা দেবতার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তারা শিশুটি ফেলে রেখে যাওয়ার সময় ভুলে গিয়েছিল মানুষের জন্য ধর্ম, ধর্মের জন্য মানুষ নয়। তারা তাদের ভুল বুঝতে পেরে দ্রুত ফিরে এসে দেখেন নির্দিষ্ট স্থানে এক ঝাঁক ময়ূর শিশুটিকে আচ্ছাদন করে রেখেছে। ময়ূরের আশ্রয়ে বেঁচে ছিল বলে ওই শিশুর নাম রাখা হয়েছিল ময়ূর ভট্ট। তাঁর নামে বাড়ীটির নামকরণ করা হয়।

ময়ূর ভট্টের বাড়ী মনসাবাড়ী নামকরণের বিষয় অনুসন্ধান করে জানা যায়, সম্ভবত এ বাড়ীর কিশোর একদিন প্রত্যুষে বাগানে ফুল কুড়াতে গিয়ে বাগানে বিরাট আকারের সাপ দেখেন। পরদিনও একই অবস্থা। তৃতীয় দিনে সাপটি তার পিছে পিছে বাড়ী এসে নৃত্য করতে থাকে। বাড়ীর লোকজন ভয় ও বিস্ময়ে বিষয়টি প্রত্যক্ষ করতে থাকেন। রাতে মনসা দেবীর মাধ্যমে আদৃষ্ট হয়ে নতুন করে মনসা মন্দির স্থাপন করে পূজা শুরু করা হয়। এখনও এ বাড়ীতে মনসা পূজার সময় সাপের সমাগম হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি। এ বাড়ীতে রয়েছে পিতলের মূর্তি। কথিত আছে, তৎকালীন সময় কীর্তিনাশা নদীতে মাছ ধরার সময় জালে এ মূর্তিটি পেয়ে জেলে অলৌকিকভাবে এ মন্দিরে এটি রেখে যান, যা আজ পর্যন্ত এ মন্দিরে আছে।

এ বাড়ী থেকে ১৯৭৩ সালে ভাষা সৈনিক ও জেলার ইতিহাস গবেষক জালাল উদ্দিন আহম্মেদ কাঠের বাঁধাই করা ও তুলট কাগজে লিখিত পুঁথি উদ্ধার করেন। এর কয়েকটি কপি নেপালে পাঠানো হয়। তার বেশ কয়েকটি কপি এখন শরীয়তপুর জেলার বেসরকারি পাবলিক লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত আছে। ধারণা করা হয়, আজ থেকে ৩/৪ শ' বছর আগে এই পুঁথিগুলো রচনা করা হয়েছিল। প্রাচীন মহিলা কবি জয়ন্তী দেবীর পিতাই ময়ুর ভট্ট ছিলেন যার থেকে শিক্ষা পেয়ে তিনি বই পুঁথিগুলো রচনা করেছেন বলে প্রবীণ শিক্ষক ও ইতিহাস গবেষক মাস্টার জালাল উদ্দিন আহম্মেদ মনে করেন। তিনি বলেন, মনসাবাড়ী ও এর আশপাশে অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র ও স্থাপনা ছিল যা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় চুরি এবং নষ্ট হয়ে যায়। তিনি আরো বলেন, ১৯৭৯ সালে শরীয়তপুরের মহকুমা প্রশাসক মো. আমিনুর রহমানের নেতৃত্বে এখানে খনন ও সংস্কার শুরু হলেও দক্ষ লোকবলের অভাবে সে সময় খনন কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তার মতে, বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ যদি বৈজ্ঞানিক উপায়ে খনন কাজ পরিচালনা করে এ বাড়ীর ইতিহাস রহেস্য উন্মোচন করতেন তাহলে আর কালের আবর্তে হারিয়ে যেতো না ইতিহাসের এই ঐতিহ্যের নিদর্শনটি।

শরীয়তপুরের দৈনিক হুংকারের বার্তা সম্পাদক এম হারুন অর রশিদ বলেন, এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি টিকিয়ে রাখতে এখনই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন। তা না হলে হয়তো কালের আবর্তে এক সময় ঐতিহাসিক নিদর্শন ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি জমিও চলে যাবে অবৈধ দখলে।

শরীয়তপুর জেলার জেলা প্রশাসক রামচন্দ্র দাস জানান, ৬শ' বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী ধানুকা মনসাবাড়ীসহ রুদ্রকর মট, মশুরার শিব মন্দির, রাজা চাঁদ রায়, কেদার রায়ের বাড়ী, মানসিংহের তোরণ, কার্তিকপুর জমিদার বাড়ী, হাটুরিয়া মিয়া বাড়ীসহ সকল ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
এই পাতার আরো খবর -
সর্বাধিক পঠিত