নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, শনিবার ২৫ জানুয়ারি ২০২০, ১১ মাঘ ১৪২৬, ২৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১
মানবতার মূর্ত প্রতীক : এম্বুলেন্স দাদা
মো. জিয়াউল হক কামাল
ভারতের শিলিগুড়ি ও জলপাইগুড়ির বিস্তীর্ণ উত্তরাঞ্চলের সমতল/পাহাড়ি উভয় এলাকাতেই অবস্থিত চা বাগান যা ‘ডুয়ার্স’ নামেও পরিচিত- হাজার হাজার একরের চা বাগানের অসংখ্য নিম্নআয়ের শ্রমিকদের বসবাস ও তাদের জীবনযাপন, চলাচল, দুর্গম এই এলাকাতেই সরু অপ্রশস্ত পথেই সীমাবদ্ধ। একদিকে বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাব অন্যদিকে সীমিত রোজগার তাই এদের জীবন এক কথায় কঠিনতর-শিক্ষা চিকিৎসার ব্যবস্থাও অপ্রতুল এবং সংকুচিত।

এমনি পরিবারের বয়স্ক এক মা রাতে বুকে তীব্র ব্যথার যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছিলেন। ছেলে, যে নিজেও চা বাগানে সীমিত আয়ের একজন শ্রমিক। প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় সে রাতে যখন যানবাহনের অভাবে হাসপাতাল, ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে বিফল- ভোরের দিকে তখন প্রকৃতির কোলে নিয়তির অমোঘ বিধান মৃত্যুর হাতে সঁপে দেয়া ছাড়া আর কিউ বা করার আছে অসহায় ছেলের। অতঃপর মায়ের মৃত্যু-ছেলের বোধোদয়! এই দু’য়ের সংমিশ্রণে আমরা পাই ‘এম্বুলেন্স দাদা’ কারিমুল হককে। যে মায়ের অসহায় মৃত্যু পরখ করে ঋণের টাকায় একটি মোটরবাইক কেনেন এবং অসুস্থ, অসহায় ও রুগ্ন মানুষের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা পাইয়ে দিতে যখনি ডাক আসে তখনি ছুটে যান। অসুস্থ মানুষটিকে বিশেষ কায়দায় প্রয়োজনে কাপড় দিয়ে নিজের সাথে বেঁধে মোটরবাইকের পিছনে বসিয়ে ৫০ কিলোমিটার দূরের মহকুমা হাসপাতালে পৌঁছে দেন এমনকি প্রয়োজনে স্বেচ্ছাদাতা খুঁজে বের করে রক্ত/ওষুধের ব্যবস্থাও করে ফেলেন সেই কারিমুল হক। গত ১৫ বছর যাবৎ ৫ হাজারেরও অধিক মানুষকে বিনামূল্যে এই সেবা ওই দুর্গম এলাকায় নিজ উদ্যোগে পাইয়ে দিয়ে সারা বিশ্বের মানুষের বাহবা, কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ, আশীর্বাদ পেয়েছেন। আলজাজিরাসহ অসখ্য টেলিভিশন চ্যানেল বিশ্ববাসীর কাছে তাকে তুলে ধরেছে বীর হিসেবে, মানবতার প্রতীক হিসেবে।

যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা তাকে প্রশংসাপত্র ও বিভিন্ন এওয়ার্ডে পুরস্কৃত করেছে। সর্বোপরি ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’ এই মর্ম বাণীতে উদ্বুদ্ধ, মানবতার সেবায় বিনা পয়সায়, নিজ অর্থে ক্রয়কৃত মোটরবাইক দিয়ে আর্তের আহ্বানে নিজেকে উৎসর্গ করা চা বাগানের এই শ্রমিক মানুষটিকে দিয়ে ভারতের অনেক এলাকায় অসংখ্য পূজাম-পসহ হিন্দু ধর্মীয় ও সামাজিক অনেক অনুষ্ঠান ফিতা কাটিয়ে উদ্বোধন করা হয়ে থাকে। ধর্ম সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।

ঠিক তেমনি এক অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ও পরিচয়। ভাবতেই কৃতজ্ঞতায় মন ভরে যায়। বন্ধুবর চিত্র শিল্পী শাহ মাইনুল ইসলাম শিল্পুর ভারত সরকারের আমন্ত্রণে শিলিগুড়িতে ৫ দিনব্যাপী একটি একক চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত নভেম্বরে। সেই প্রদর্শনীতে শিল্পুর সফরসঙ্গী হিসেবে তথা ভারত ভ্রমণের দুর্লভ সুযোগটি হাতছাড়া না করে চলে গেলাম ভারতে। চিত্র প্রদর্শনী উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সে দেশের বরেণ্য অনেক চিত্রশিল্পীসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকলেও প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ‘এম্বুলেন্স দাদা’ কারিমুল হক। তার হাতে ফিতা কেটে উদ্বোধন করা হয় প্রদর্শনীটির। তার উপস্থিতি সকলকে অনুপ্রাণিত করেছে নিঃসন্দেহে। সেখানেই তার সঙ্গে অনেক সময় থাকবার সুযোগ, আলাপচারিতা, সাথে সেলফি, সেই সেলফি তুলতে গিয়ে আমার বিঘ ঘটায় নিজেই সেলফি তুলে দিলেন সদা হাস্যোজ্জ্বল অনুষ্ঠানের মধ্যমণি সেই মহামানব।

প্রদর্শনী উদ্বোধনের পরদিন রওনা হলাম প্রকৃতির বিস্ময় ভারতের তথা এশিয়ার অন্যতম ভূস্বর্গ দার্জিলিং-এ। শিলিগুড়ি থেকে ৮৩ কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ি এই পথে অনেক চড়াই-উতরাই, নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের প্রতি পলকহীন দৃষ্টি ফেরাতে না ফেরাতে কখন যে, ৩ ঘণ্টারও অধিক সময় পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম দার্জিলিং বুঝতেই পারিনি। পথ চলাকালীন রবিঠাকুরের ভাষায় মনে হচ্ছিল ‘বড় বড় দুরাশার মোহে জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলোকে উপেক্ষা করে আমাদের জীবনকে কী উপবাসী করেই রাখি’।

প্রকৃতির অকৃত্রিম অপার লীলাভূমি দার্জিলিং এর অপর এক বিস্ময় সমভূমি থেকে ৭৪০০ ফুট উঁচু পাহাড়ে অবস্থিত পৃথিবীর সর্বোচ্চ রেলস্টেশন ‘ঘুম’। যা শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত বিস্তৃত ‘দার্জিলিং-হিমালয়ান রেলওয়ে’ নামে ১৮৮১ সালে অবিভক্ত ভারতে অনুপ্রবেশকারী ব্রিটিশদের ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির দ্বারা তৈরি এবং যে রেলপথটি দার্জিলিং থেকে ১২৪ কিলোমিটার দক্ষিণে শিলিগুড়ির নিউজলপাইগুড়ি জংশন স্টেশনে এনে সর্বভারতীয় রেলপথের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এটি একটি বিশেষায়িত রেলপথ। বিশ্বব্যাপী প্রচলিত রেলপথগুলো প্রধানত ৩টি ধারণার উপর তৈরি হয়ে থাকে- ব্রডগেজ, মিটারগেজ ও ন্যারোগেজ। হালকা, স্বল্পসংখ্যক যাত্রী পরিবহণে সমর্থ্য শেষোক্ত ন্যারোগেজ রেলপথটির প্রচলন খুব সীমিত। যা ঝুঁকিপূর্ণ দুর্গম পাহাড়ি এই পথে তৎকালে সীমিত প্রচলিত সড়কপথের সমান্তরালে অন্যতম প্রধান দ্বৈত যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে প্রবর্তন করা হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। সারা ভারতে ইলেক্ট্রিক, ডিজেল ইঞ্জিন চালিত রেল চললেও আজও এই পথেই কেবল স্টিম ইঞ্জিনচালিত ‘টয় ট্রেন’ ১২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই দার্জিলিং ভ্রমণ পথের অন্যতম আকর্ষণও বটে।

দার্জিলিং-এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বর্ণনা করা দুঃসাহস, দুরাশা এবং ধৃষ্টতা তাই- সেপথে যাচ্ছি না। এর নামের উৎস খুঁজতে গিয়ে ২টি ধারণা পাওয়া যায়। ব্যুৎপত্তি অনুযায়ী ১ম টি ‘Dar-jya-lyang’ এর অর্থ দেবতাগণের আবাসভূমি। ২য়টি তিব্বতীয় ভাষায় ‘Dorja’ শব্দের অর্থ মেঘ/বজ্র এবং ‘Dorja’ শব্দের অর্থ স্থান। দুটো অর্থই স্থানটির জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। কেননা ১৮০০ শতাব্দীর প্রথম দিকে পাহাড়ি, দুর্গম, জনবিরল এই ভূমি শুধু দেব আর বজ্র/মেঘের আদর্শ বাসস্থান হওয়াই যেন স্বাভাবিক। যেখানে হাতে গোনা কিছু ‘লেপচা ও ভূটিয়া’ আদিবাসী সিকিমের অন্তর্গত এই দার্জিলিংয়ের অধিবাসী হিসেবে বসবাস করত। ১৭৭৫ এর পূর্বে নেপালী গোরখারাজ কর্তৃক আক্রান্ত এবং দখলের পূর্ব পর্যন্ত দার্জিলিং সিকিমের অন্তর্গত ছিল।

উত্তরে চীন, পশ্চিমে নেপাল, পূর্বে তিব্বত ও ভুটান, দক্ষিণে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত নির্জনবাসী, ধ্যান-তপস্বি বৌদ্ধ সন্ন্যাসিদের আবাসভূমি হিসেবে পূর্ব পরিচিত তিস্তা বিধৌত অপরূপ ভূস্বর্গ সিকিম। তিব্বতীয় তুষার স্রোতে উৎপন্ন তিস্তা রণজিত, লোনাক, তালুং ও লাচুং উপনদীর মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে প্রায় ২৩ হাজার ফুট নিচে এসে গঙ্গা অববাহিকায় পতিত হয় এবং তার ৩২০ কিলোমিটার যাত্রাপথে আমাদের রংপুর অঞ্চলের চিলমারীতে এসে যমুনায় মিশে যায়। সিকিম Namgyal বংশীয় বৌদ্ধ সন্ন্যাসিরাজা ‘Chogyal’-এর বংশানুক্রমিক রাজত্ব কর্তৃক ১৮৪০ সালে Enchey মন্দির প্রতিষ্ঠার পর তীর্থ স্থানে রূপান্তরিত হয় এবং এই স্থানের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে আরম্ভ করে। সকল প্রকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটতে থাকে এবং নতুন রাজপ্রাসাদসহ অনেক রাজকীয় গুরুত্বপূর্ণ ভবন তৈরি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৯৪ সালে Tumlong থেকে সিকিমের রাজধানী গ্যাংটকে স্থানান্তরিত হয়।

কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ভৌগলিক অবস্থানের কারণে চারপাশের দেশগুলোর অনেকেই তাকে করায়ত্ত করতে চেয়েছে আর তাই সে আক্রান্ত হয়েছে বহুবার। রাজা Thutob Namgyal এর সময় ৪০ বছরব্যাপী অধিকৃত/অতিষ্ঠ সিকিম তৎকালীন ব্রিটিশদের সহায়তায় আগ্রাসন হতে পুনরুদ্ধার হয় এবং পুরস্কার বাবদ ২৪ মাইল দীর্ঘ এবং ৫/৬ মাইল প্রশস্ত জনবিরল, পাহাড়ি স্থান দার্জিলিং ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশদের নিকট প্রথমে নিঃশর্ত সমর্পণ করে, ১৮৪১ হতে বার্ষিক ১০০০০০ টাকায় এবং ১৮৪৬ থেকে বছরে ৬০০০ টাকা বৃদ্ধির শর্তে এককালীন ইজারা দেয় যা ১৯৪৭ এ ভারতের স্বাধীনতা লাভের কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। বৌদ্ধ ধর্মগুরু Chogyal এর বংশানুক্রমিক রাজত্ব ১৬৪২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত বলবৎ থাকাকালীন নিজেকে রক্ষায় অপারগ সিকিম সর্বশেষ ১৬ মে ১৯৭৫ এ শর্তসাপেক্ষে ভারতের আশ্রিত রাজ্য (Protectorate state) তথা কনিষ্ঠতম প্রদেশে পরিণত হয়।

এই সমস্ত দর্শনীয় স্থান পরিভ্রমণকালে রবিঠাকুরকে খুব বেশি মনে পড়ে যায়। বিশেষ করে পাহাড়ি এই সুন্দরতম স্থানগুলো আবিষ্কার, তা ভোগ করার প্রবণতা এবং দখলে রাখার শাশ্বত আবেদন যেন বার বার তার সেই বাক্যগুলো মনে করিয়ে দেয় ‘যেখানে মেঘে কুয়াশায় বরফে অন্ধকারে প্রকৃতি আচ্ছন্ন, সংকুচিত, সেখানে মানুষের খুব কর্তৃত্ব- মানুষ সেখানে আপনার সকল ইচ্ছা সকল চেষ্টাকে আপনার মনে করে আপনার সকল কাজকে চিহ্নিত করে রেখে দেয়-পসটারিটির দিকে তাকায়, কীর্তিস্তম্ভ তৈরি করে, জীবনচরিত লেখে এবং মৃতদেহের উপরেও পাষাণের চির স্মরণগৃহ নির্মাণ করে- তার পরে অনেক চিহ্ন ভেঙে যায়, অনেক নাম বিস্মৃত হয়, কিন্তু সময় অভাবে সেটা কারো খেয়ালে আসে না’।

মো. জিয়াউল হক কামাল : লেখক
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত
ফটো গ্যালারি
আজকের পত্রিকা
আজকের নামাজের সময়সূচীআগষ্ট - ৮
ফজর৪:০৯
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪১
মাগরিব৬:৪০
এশা৭:৫৯
সূর্যোদয় - ৫:৩১সূর্যাস্ত - ০৬:৩৫
পুরোন সংখ্যা
বছর : মাস :
আজকের পাঠকসংখ্যা
৪৩৬৫.০
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতিঃ সৈয়দ এম. আলতাফ হোসাইন। সম্পাদক : আহ্সান উল্লাহ্। প্রকাশক ছৈয়দ আন্ওয়ার কর্তৃক রোমাক্স লিমিটেড, তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে মুদ্রিত। সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : খলিল ম্যানশন (৩য়, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা), ১৪৯/এ, ডিআইটি এক্সটেনশন এভিনিউ, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত। ফোন : ৯৩৫৭৭৩০ (বার্তা), ৮৩১৫৬৪৯ (বাণিজ্যিক), ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪.
ই-মেইলঃ djanata123@gmail.com, bishu.janata@gmail.com
ফোনঃ ০২৮৩১৫১১৫, ০২৮৩১৫৬৪৯ ফ্যাক্সঃ ৮৮-০২-৮৩১৪১৭৪
Copyright The Dainik Janata © 2010 Developed By : orangebd.com.