নিবন্ধিত হোন |
ইউজার সাইনইন
ই-মেইলঃ
পাসওয়ার্ডঃ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন?
ই-মেইলঃ 
বন্ধ করুন (X)
ঢাকা, বৃস্হপতিবার ২৩ জানুয়ারি ২০১৪, ১০ মাঘ ১৪২০, ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৫
জনতার মত
শিশুর জন্ম নিবন্ধন কেন প্রয়োজন?
কাঞ্চন দত্ত
সিমির বয়স ১৩ বছর। এবার জেএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। এরই মধ্যে বিয়ের আয়োজন চলছে। পাত্র পাশের গ্রামের সিমির দ্বিগুণেরও বেশি বয়সী রিংকু। সিমি এ বিয়ে করবে না বলে বাবা-মাকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। তার একটাই কথা লেখাপড়া শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে তারপর বিয়ে করবে। কিন্তু সিমির বাবা-মার কাছে তার মতামতের কোনো মূল্য নেই। তাদের যুক্তি রিংকু পাত্র হিসেবে ভালো, সচ্ছল পরিবার। সিমিকে অভাব অনটনে থাকতে হবে না। অশিক্ষিত বাবা-মা কাজীর সহযোগিতায় বয়স বাড়িয়ে বিয়ে দিচ্ছেন। তারা সিমিকে বঞ্চিত করছে শিক্ষা পাওয়ার অধিকার থেকে, ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চিত জীবনের দিকে। জন্ম নিবন্ধন সনদ থাকলে সিমিকে বাল্য বিবাহের অভিশাপ থেকে রক্ষা করা যেত।

শিশু জন্মগ্রহণ করে কিছু অধিকার নিয়ে। খাদ্য, নিরাপত্তা, আদর-ভালোবাসা, পরিচিতি, জাতীয়তা, স্বাস্থ্যসেবা, লেখাপড়ার সুযোগ সবই তার অধিকার। শিশু জন্মের পর পরিবারে মা-বাবা বা অন্য সদস্যরা শিশুর নামকরণ করে থাকেন। প্রতিটি শিশুর অধিকার নিশ্চিতকরণে নামকরণের পাশাপাশি তার জন্ম নিবন্ধন করা অত্যন্ত জরুরি। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও জন্ম নিবন্ধন হয়েছে মূলত বহির্বিশ্বে গমন বা বিশেষ প্রয়োজনে। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন রয়েছে ব্রিটিশ আমল থেকেই কিন্তু তার কার্যকারিতা ছিল খুবই নগণ্য। এখন সময় পাল্টেছে। জন্ম নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে সরকার জন্ম নিবন্ধনকে বাধ্যতামূলক করেছে।

জন্ম নিবন্ধনের গুরুত্ব অপরিসীম। জন্ম নিবন্ধন শিশুর জাতীয়তা, বয়স, নামকরণ, স্থায়ী ঠিকানা ইত্যাদি মৌলিক বিষয়ের নিশ্চয়তা দেয়। এছাড়া পাসপোর্ট ইস্যু, বিবাহ রেজিস্ট্রেশন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগদান, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু, ভোটার তালিকা প্রণয়ন, জমি রেজিস্ট্রেশন, ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন সার্টিফিকেট পেতে, ট্যাঙ্ প্রদানে, ব্যাংক হিসাব খুলতে, গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎ- টেলিফোন সংযোগ নিতে ইত্যাদি ক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধন সনদ প্রদর্শন সরকার আইনের দ্বারা বাধ্যতামূলক করেছে।

শিশু কোন এলাকায় জন্ম গ্রহণ করেছে তার ওপর নির্ভর করে জন্ম নিবন্ধনের স্থান। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে জন্মনিবন্ধনের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি দায়িত্বপ্রাপ্ত যেমন- সিটি করপোরেশন এলাকায় জন্মগ্রহণকারী মৃত্যুবরণকারী অথবা স্থায়ীভাবে বসবাসকারী ব্যক্তিদের জন্য সিটি করপোরেশনের মেয়র বা তিনি যে কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেবেন সেই কর্মকর্তা বা কমিশনার। পৌরসভা এলাকায় জন্মগ্রহণ করলে পৌরসভার চেয়ারম্যান বা প্রশাসক বা তিনি যে কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেবেন সেই কর্মকর্তা বা কমিশনার। ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা সরকার যে কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেবেন সেই কর্মকর্তা। ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের প্রেসিডেন্ট বা তিনি যে কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেবেন সেই কর্মকর্তা এবং বিদেশে জন্মগ্রহণকারী ও মৃত্যুবরণকারী কোনো বাংলাদেশীর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত বা তিনি যে কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেবেন সেই কর্মকর্তা এই দায়িত্ব পালন করবেন।

শিশুর পিতা-মাতা বা অভিভাবক জন্ম তথ্য প্রদানে প্রথম ব্যক্তি। তিনি শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে জন্ম সংক্রান্ত তথ্য নিবন্ধকের নিকট প্রদান করবেন। এ ছাড়াও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য এবং সচিব, গ্রাম পুলিশ, সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার কমিশনার, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন বা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিবার কল্যাণকর্মী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সেক্টরে নিয়োজিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের (এনজিও) মাঠকর্মী, কোনো সরকারি, বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক বা মাতৃসদনে জন্মগ্রহণকারী শিশুর তথ্যের ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত মেডিকেল অফিসার বা ডাক্তার, জেলখানায় জন্মগ্রহণের ক্ষেত্রে জেলসুপার বা জেলার বা তৎকর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি, পরিত্যক্ত শিশু বা সাধারণ স্থানে পড়ে থাকা পরিচয়হীন শিশুর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং নির্ধারিত অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান শিশুর জন্ম সংক্রান্ত তথ্য নিবন্ধকের নিকট প্রেরণ করতে পারবেন। সরকারের বিশেষ উদ্যোগের ফলে জন্ম নিবন্ধন এখন শতভাগের দোড় গোড়ায়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ইতোমধ্যে দেশের ১৫ কোটির বেশি মানুষ জন্ম নিবন্ধনের আওতায় এসেছে। অপরদিকে মৃত্যু নিবন্ধনও হয়েছে প্রায় ১ কোটি মানুষের। জন্ম নিবন্ধন ফি থেকে সরকার ইতোমধ্যে আয় করেছে ২৬ কোটি টাকার বেশি। এ বছরের জুন মাসের মধ্যে সব নাগরিক জন্ম নিবন্ধনের আওতায় চলে আসবে বলে আশা করা যায়।

১৮৭৩ সালে তদানিন্তন বৃটিশ ভারতে প্রথম জন্ম ও মৃত্যু বিষয়ক একটি আইন পাশ হয়। আর বাংলাদেশে ২০০৪ সালে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন করা হয়। ২০০৪ সালে আইন করা হলেও ২০০৬ সালের জুলাই থেকে তা কার্যকর হয়। জনসচেতনতার অভাবে অনেকেই নিয়মানুসারে জন্ম নিবন্ধন করেন না। আইন অনুযায়ী ৪৫ দিনের মধ্যে জন্ম নিবন্ধন করাতে হবে। ১৮ বছরের নিচে বয়সীদের ক্ষেত্রে বিনা ফিতে জন্ম নিবন্ধন করা যাবে। আর ১৮ বছরের ঊধর্ে্ব জন্ম নিবন্ধন করতে হলে ৫০ টাকা ফি দিতে হবে। তবে গত বছরের জুলাই থেকে নতুন নিয়ম করা হয়েছে। এই তারিখের পর থেকে দুই বছরের মধ্যে কোনো মানুষের জন্ম অথবা মৃত্যু হলে তাদের নিবন্ধন করতে ফি লাগবে না।

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সংশোধন আইন ২০১৩ অনুযায়ী জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন না করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। পাশাপাশি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের ভুল তথ্য দিলে তাদের শাস্তির বিধান রয়েছে। ভুল তথ্য দাতাদের ৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং এক বছরের কারাদ- অথবা উভয় দ-ে দ-িত হবেন।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পদক্ষেপ হিসেবে ২০১০ সাল থেকে অনলাইন জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়। সারাদেশে সরাসরি জন্ম নিবন্ধনের পাশাপাশি অনলাইনেও নিবন্ধন কার্যক্রম চলছে। ইতোমধ্যে দেশের ৫৫টি জেলায় ও বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের ১৭টি দূতাবাসের মাধ্যমে এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রায় শতভাগ মানুষ জন্ম নিবন্ধনের আওতায় এসেছে। বাংলাদেশ সরকারের জন্ম নিবন্ধন কার্যক্রমের সাফল্য বিদেশেও ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। প্রতি বছর ৩ জুলাই 'জন্ম নিবন্ধন দিবস' জাতীয়ভাবে পালন করা হয়ে থাকে।

জন্ম নিবন্ধন শিশুর অধিকার। এ অধিকার নিশ্চিত করতে শিশুর অভিভাবককে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধন সনদ অত্যন্ত জরুরি। তাই প্রতিটি শিশুর জন্মের পর জন্ম নিবন্ধন এবং মৃত্যুর পর মৃত্যু নিবন্ধন করা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব।

কাঞ্চন দত্ত : লেখক
এই প্রতিবেদন সম্পর্কে আনার মতামত দিন।
মতামত দিতে চাইলে অনুগ্রহ করে করুন।
আপনার কোন একাউন্ট না থাকলে রেজিষ্ট্রেশন করুন।
সর্বাধিক পঠিত